বৈদিক প্রশ্নোত্তর - আর্য সমাজ - VedasBD.com

Breaking

Tuesday, 21 January 2020

বৈদিক প্রশ্নোত্তর - আর্য সমাজ

বৈদিক প্রশ্নোত্তর


ঈশ্বরের ধারনার উপর প্রশ্ন 

প্রশ্ন-ঈশ্বর কি? 
→ঈশ্বরের বিভিন্ন ধরনের সংজ্ঞা হতে পারে। (ঈশ্বর) অসীম এবং শরীরবৃত্তিয় চেতনা জগতের বাইরে হওয়ার কারনে, ঈশ্বর শব্দের অর্থ কয়েকটি শব্দ বা বাক্যে প্রকাশ করাটা কঠিন। তুলনামূলক উপযুক্ত সংজ্ঞাগুলাে নিম্মরূপ হতে পারেঃ ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ- অস্তিত্বমান, বুদ্ধিমান ও আনন্দময়।
ঈশ্বর নিরাকার
ঈশ্বর সর্বশক্তিমান
তিনি সর্বজ্ঞ তিনি ন্যায়কারী
তিনি দয়ালু তিনি জন্মহীন বা অজন্ম
তিনি অনন্ত
তিনি নির্বিকার
তিনি অনাদি তিনি অনুপম তিনি সর্বধর - সকল কিছুর ধারনকারী
তিনি সর্বেশ্বর
তিনি সর্বব্যাপক তিনি সর্বঅন্তর্যামী তিনি অজর
তিনি অমর
তিনি অভয়
তিনি নিত্য তিনি পবিত্র
তিনি সৃষ্টিকর্তা
কিন্তু পরের অংশে। যা দিয়ে শুরু করলাম তাতে এটা বােঝার জন্য যথেষ্ট যে ঈশ্বর জগতের | (অভ্যন্তরিন ও বাইরের সকল দিকের) পরিচালক। এটা জীবন ও জগতের মূল্যায়নের একটা সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মাধ্যমের সংকেত হতে পারে। এবং একদিন আমরা বিশ্লেষন প্রক্রিয়া শুরু করতে সক্ষম হব, ঈশ্বরের বাকী বিশেষন আপনাআপনিই পরিষ্কার হবে।
.
চল দেখাই ঋগবেদ এই পরম সত্তা সম্পর্কে কি বলেঃ
ঋগবেদ ১।১৬৪।৩০
সেই এক পরম সত্তা যিনি স্বার্থহীন, এই পুরাে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করেন, তিনি সর্বত্র বিদ্যমান এবং দেবগনেরও দেবতা, একমাত্র তিনিই আনন্দের উৎস। যারা তাকে অনুধাবন করে না দুঃখে নিমজ্জিত হয় এবং যারা তাকে অনুধাবন করে তারা শর্তহীন আনন্দ অনুধাবন করে।
.
প্রশ্ন আচ্ছা বেদে কয়জন দেবতা? 
→আমরা শুনেছি যে বেদে অনেক দেবতা আছেন। বেদ পরিষ্কারভাবে বলে শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন। বেদে এমন কোন মন্ত্র নেই যেটা বহু ঈশ্বরের কথা বলে। শুধুমাত্র তাই নয় অধিকন্তু বেদ দেবদূত, নবী, অবতারকে বাতিল করে দেয় যাদের কিনা প্রয়ােজন হয় ঈশ্বর ও আমাদের মধ্যকার এজেন্টের কাজ করতে। মােটামুটি বর্ণনা দিতে গেলেঃ
.
বেদের ঈশ্বর = খ্রিস্টধর্মের যীশুর প্রতি আত্মসমর্পণের প্রয়ােজনীয়তা বাদ যাবে।
.
বেদের ঈশ্বর = ইসলামের আল্লাহ্ পর্যন্ত এবং শেষ নবী হিসেবে মুহাম্মদকে গ্রহনের বাদ যাবে।
.
অন্যভাবে বলা যায় যদি কেহ "শাহদা" এর প্রথম অংশ উচ্চারন করে "লা ইলাহা ইল আল্লাহ" (অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই) কিন্তু দ্বিতীয় অংশ "মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" (অর্থাৎ মুহাম্মদ তার বার্তাবাহক) বাতিল করে তাহলে সে বৈদিক ঈশ্বরের ধারনার কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছে। ইসলামে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারাে উপাসনা করা শিরক বা মহাপাপ। যদি এই ধারনাটিকে আরাে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আল্লাহ্ র সাথে মােহাম্মদ বা গেব্রিয়েলের স্মরন করার প্রয়ােজনীয়তা অস্বীকার করা হয়, তাহলে বলা যায় বেদ অনুসারে শিরক পরিহার করা গেল।
.
প্রশ্ন- বেদে উল্লেখিত বিবিধ দেবতার ব্যাপারটা কি? ৩৩ কোটি দেবতার বিষয়টাই বা কি? 
→"দেবতা" একটি ভিন্ন বিষয় কিন্তু প্রায়ই (এই শব্দ দ্বারা) ভুলবশত পরম সত্তা ঈশ্বর অর্থ ধরা হয়। অস্তিত্ববান যেকোন কিছু জড় বা জীব যেটা আমাদের সাহায্য করে বা যেটা আমাদের নিকট উপকারী তাকে "দেবতা" বলা হয়। তার মানে এটা নয় যে প্রত্যেকটা সত্তাই ঈশ্বর এবং আমাদের উচিত তার উপাসনা করা। বেদের কোথাও উল্লেখ নেই যে আমাদের এই সকল বিষয় সমূহকে উপাসনা করতে হবে। তবে হ্যা ঈশ্বর হলেন দেবতাগনের  মূল এবং তাই তাঁকে "ব্রহ্ম" বলা হয়। সুতরাং একমাত্র তিনিই উপাসনার যােগ্য।
.
বেদ কখনই ৩৩ কোটি দেবতার কথা বলে না, বরং ৩৩ প্রকার (সংস্কৃত শব্দ "কটি" অর্থ প্রকার)দেবতার কথা বলে। শতপথ ব্রাহ্মনে এটি পরিষ্কার বর্ণনা করা হয়েছে। তারা হলােঃ
.
 ৮ বসু = ভুমি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ, চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজি যেগুলাে মহাবিশ্বের উপাদানকে গঠন করে যেখানে আমরা বসবাস করি। 
.
১১ রুদ্র = পান, অপান, ব্যান, উদান, সমান, নাগ, কুর্ম, কুকালা, দেবদত্ত, ধনঞ্জয় এবং এক প্রান। 
 .
১২ আদিত্য = বছরের ১২ মাস 
.
১ বিদ্যুৎ = তড়িৎ চুম্বকীয় শক্তি যেটা আমাদের প্রচুর কাজে লাগে। 
.
১ যজ্ঞ = মনুষ্যকৃত মহান, স্বার্থহীন কর্ম। 
.
এই ৩৩ দেবতার প্রধান নিয়ন্ত্রক হলেন মহাদেবতা বা ঈশ্বর একমাত্র তিনিই উপাস্য শতপথ ব্রাহ্মনের ১৪তম খন্ড অনুযায়ী। ৩৩ দেবতার এই ধারনাটি নিজেই একটি গবেষনাভিত্তিক বিষয় এবং এটি যথাযথভাবে বুঝতে আরাে গভীর পড়াশােনা দরকার। যা হােক, সকল বৈদিক গ্রন্থে এটি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে তারা (৩৩ দেবতা) ঈশ্বর নন এবং উপাস্যও নন। ঈশ্বরের আছে প্রচুর সম্পদ। অজ্ঞ জনেরা ভুলবশত ঈশ্বরের সম্পদগুলােকে ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বর মনে করেন। ধরা যাকঃ পত্রিকায় দুই ধরনের শিরােনাম হলাে একটি শিরােনামে উল্লেখ করা হলাে নরেন্দ্র, আরেকটিতে উল্লেখ করা হলাে মােদী। তারমানে এটা বােঝায় না। ভারতের দুজন প্রধানমন্ত্রী আছে!!
.
প্রশ্ন- বেদ থেকে এমন কোন মন্ত্র উল্লেখ করা যাবে যেটা বােঝায় যে এক এবং একজন মাত্র ঈশ্বর আছেন? 
→বেদে বিভিন্ন মন্ত্র আছে যেটা পরিষ্কার উল্লেখ করেছে এক এবং একজনমাত্র ঈশ্বর আছেন যার কোনাে সহকারী নেই, নেই কোন এজেন্ট, নবী বা অধঃস্তন কেউ যিনি ঈশ্বর ও আমাদের মাঝে যােগাযােগ করিয়ে দেন। যেমনঃ
.
যজুবেদ ৪০।১ 
এই পুরাে জগত (তাহাতে) নিহীত আছে এবং পরিচালিত হচ্ছে এক এবং একমাত্র ঈশ্বর কর্তৃক। কখনাে অন্যায় করতে এবং অসৎ উপায়ে ধন কামনা করতে সাহস করবেনা। তার পরিবর্তে সঠিক পথ অনুসরন কর তাঁর আনন্দ উপভােগ কর। সবশেষে তিনিই একমাত্র সকল আনন্দের উৎস।
.
ঋগবেদ ১০।৪৮।১
একমাত্র ঈশ্বর সর্বত্র বিদ্যমান এবং সারা জগতের পরিচালনাকারী। একমাত্র তিনিই বিজয় দান করেন এবং জগতের শ্বাশত কারন সকলের উচিত তাঁকে সন্ধান করা যেভাবে শিশুরা তাদের পিতাকে সন্ধান করে। একমাত্র তিনিই আমাদের পুষ্টি ও আনন্দ দান করতে পারেন।
.
ঋগবেদ ১০।৪৮।৫ 
ঈশ্বর পুরাে জগতকে আলােকিত করেন। তিনি অপরাজেয় ও অমর। তিনি জগতের সৃষ্টিকর্তা। সকলের উচিত জ্ঞান অন্বেষন ও সেই অনুসারে কাজ করে আনন্দের অনুসন্ধান করা। ঈশ্বরের বন্ধুত্ব হতে দূরে থাকা তাদের কখনােই উচিত নয়।
.
ঋগবেদ ১০।৪৯।১
সত্যান্বেষীদের প্রতি একমাত্র ঈশ্বরই সত্যজ্ঞান প্রকাশ করেন। একমাত্র তিনিই জ্ঞানের প্রবর্তক এবং আনন্দ অনুসন্ধানী ধার্মিকদের পবিত্র কর্মে উদ্বুদ্ধ করেন। একমাত্র তিনিই সৃষ্টিকর্তা ও জগতের পরিচালনাকারী। তাই, এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর ভিন্ন কারাে উপাসনা কোরাে না।
.
যজুবেদ ১৩।৪ সারা জগতের একজন মাত্র সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালক আছেন। একমাত্র তিনিই পৃথিবী, আকাশ এবং অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তুসমূহকে পরিপুষ্ট করছেন। তিনি স্বয়ং আনন্দময়। একমাত্র তিনি আমাদের উপাস্য হতে পারেন।

অথর্ববেদ ১৩।৪।১৬-২১ তিনি দুইটি নন, তিনটি নন, চার, পাঁচ কিংবা ছয়ও নন, আট, নয় কিংবা দশ নন। বিপরীতে তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ব্যাতিত আর কোন ঈশ্বর নেই। সকল দেবতাগন তাহাতে নিহীত থাকে এবং তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তাই একমাত্র তিনিই উপাস্য, অন্য কেউ নয়।
.
অথর্ববেদ ১০।৭।৩৮ 
একমাত্র ঈশ্বর মহান ও তিনিই উপাসনার যােগ্য। তিনিই সকল জ্ঞান ও কর্মের উৎস।
.
যজুর্বেদ ৩২।১১ 
ঈশ্বর জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবস্থিত। কোন কিছুই তিনি ব্যাতিত নেই। তিনি স্বয়ং পূর্ণ এবং তাঁর দায়িত্ব পালন করতে কোন এজেন্ট, দেবদূত, নবী বা অবতারের কোন সাহায্যের দরকার নেই। যে ইহা অনুধাবন করতে পেরেছে সে ঈশ্বরকে অর্জন করেছে এবং উপভােগ করে শর্তহীন আনন্দ বা মােক্ষ।
এ ধরনের অসংখ্য মন্ত্র বেদে আছে যাহা এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরকেই বর্ণনা করে এবং আমাদেরকে নির্দেশনা প্রদান করে অন্য কোন সত্তা, অবতার, নবী, দেবদূত অথবা এজেন্টকে আবাহন করা ছাড়াই তাঁকে (ঈশ্বরকে) সরাসরি উপাসনা করতে।
 .
 প্রশ্ন- কেন আমাদের ঈশ্বরে বিশ্বাস করা উচিত? 
→আমাদের ঈশ্বরে বিশ্বাস করা উচিত ঠিক যেকারনে আমরা সূর্য, চন্দ্র, গােলাকার পৃথিবী, পরমানু, অনু, উত্তাপ, তড়িৎ শক্তি ইত্যাদি বিশ্বাস করি। আমাদের অস্তিত্বমান সকল কিছুকে বিশ্বাস করা উচিত, এবং বাতিল করা উচিত যার অস্তিত্ব নেই তাকে।
জীবনের প্রাথমিক শর্ত হলাে "সত্য" = পরমসুখ বা মুক্তির সত্য। এবং সত্যের অর্থ হলাে যা অস্তিত্বমান তাকে অনুধাবন করা। তাই আমাদের উচিত ঈশ্বরে বিশ্বাস করা, কারন তিনি অস্তিত্বমান।
.
প্রশ্ন-  কিন্তু আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করা ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারছি। এটা কি সত্যি নয়? 
→হ্যা এটা সত্য। একজন দিব্যি জীবন ধারন করতে পারে তড়িৎশক্তিকে বিশ্বাস না করে। এমনকি অনেক আদিবাসী এভাবে জীবন ধারন করেও। কিন্তু সুখকে বর্ধিত করতে হলে আমাদের বিদ্যুৎশক্তিকে বিশ্বাস করাই ভালাে যাতে আমরা এটাকে আমাদের কাজে ব্যবহার করতে পারি। অনেকে বলতে পারে তড়িৎশক্তি সম্পর্কে না জেনেও তাে অনেকে সুখে থাকতে পারে। তাহলে আমার পাল্টা প্রশ্ন থাকবে কোন বিবেকবান ব্যাক্তি কি রাজী হবে বিদ্যুৎশক্তির আরামদায়ক জীবনকে বিদ্যুৎহীন জীবনের সাথে বিনিময় করে নিতে? যেটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয় বিদ্যুৎশক্তি দিয়ে যে আরামের ব্যবস্থা করা যায় সেটা বিদ্যুৎ বিহীন অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি। জীবনের মূলনীতি হল "জ্ঞান প্রাপ্ত করায় শক্তিকে এবং এভাবেই উচ্চতর সুখকে।" যেকোন বিবেকবান ব্যাক্তি এই নীতিতেই চালিত হন।
একটু ভেবে দেখুন, যদি বিদ্যুৎশক্তির জ্ঞান এতটা সুখ স্বাচ্ছন্দ এনে দিতে পারে তাহলে বিশুদ্ধ সুখের উৎস পরমেশ্বরকে ব্যবহার করার ক্ষমতা ও জ্ঞান এবং তা হতে উৎসারিত আনন্দ কেমন হতে পারে।
.
প্রশ্ন - কেউ কখনাে ঈশ্বরকে দেখেনি। তাহলে কিভাবে বলব ঈশ্বর অস্তিত্বমান? কেউ কখনাে বিদ্যুৎশক্তিকে দেখেনি, উত্তাপকে দেখেনি বা এমনকি অতি পারমানবিক অংশগুলােকে দেখেনি । কেউ কখনাে ফোটন বা কোয়ার্ককে দেখেনি। কেউ কখনাে আলােক তরঙ্গ, উত্তাপের বিকিরন দেখেনি। তাহলেও আমরা কেন বলি তারা অস্তিত্বমান? 

→আমরা জানি ফোটন অস্তিত্বমান কারন আমরা এর প্রভাব দেখতে পাই যেটা ব্যাখ্যা করা যায় না। একইভাবে এটা বিদ্যুৎশক্তি, অতিপারমানবিক অংশ, উত্তাপ ও আলােক তরঙ্গের ক্ষেত্রেও সত্যি। ঠিক এভাবেই! আমরা নির্বস্তুক বিষয়গুলােকে বিশ্বাস করি কারন আমরা এর প্রভাবগুলােকে দেখতে পাই। চক্ষুগুলাে হলাে জগতকে অনুধাবন করার যথাযথপ্রায় (শতভাগ যথাযথ নয়) ইন্দ্রিয়। যা আমরা চোখ দিয়ে দেখতে পাইনা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে পারি। কিন্তু এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপও একটা নির্দিষ্ট সীমার নিচে ক্ষুদ্রাংশগুলাে দেখতে পায় না । অন্যান্য অনুভুতির ব্যাপারেও যেমন শােনা, অনুভুতি ইত্যাদির ক্ষেত্রেও বিষয়টা সত্য। এইভাবে পুরাে আধুনিক বিজ্ঞান আমরা যা দেখি বা শুনি তার উপর ভিত্তি ধরেনা বরং ভিত্তি ধরে এর প্রভাবের মাধ্যমে আমরা কি অনুধাবন করতে পারি। এবং এটি (আধুনিক বিজ্ঞান) যা করে তা হলাে এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে একটা বিশেষ মডেল সৃষ্টি করে। এভাবেই এই সকল ফোটন, ইলেকট্রন ও কোয়ার্ক এগুলাে প্রকৃতপক্ষে মডেলের উপাদান যেটা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এই মডেলগুলােরও আরাে গভীরে গেলে সেখানে কিছু বাস্তবতা আছে যেটা আধুনিক বিজ্ঞানের এই মডেলগুলাে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এবং এই বাস্তবতাগুলােকে ব্যাখ্যা করতে এমনকি এই সকল মডেলগুলাের পিছনের কারন ব্যাখ্যা করতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতেই হবে।
.
প্রশ্ন- কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বিশ্বাস করে যা পরিমাপ করা যায়। আমরা ঈশ্বরকে পরিমাপ করতে পারি না, তাহলে আমরা কিভাবে তাঁর অস্তিত্বকে স্বীকার করব? 
→এটা আরেকটা কল্প কথা। পরিমাপ হলাে তৃতীয় ধাপ। প্রথম ধাপ হলাে পরােক্ষভাবে নিরীক্ষন করা, দ্বিতীয় ধাপ হলাে প্রত্যক্ষভাবে নিরীক্ষন করা এবং তারপর আসে পরিমাপের বিষয়টি। প্রত্যক্ষভাবে নিরীক্ষন ও পরিমাপ করার ক্ষমতাটি নির্ভর করে আমরা কত সুক্ষ্ম যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করতে পারছি তার উপর। নিউটনের টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পূর্বে বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহগুলাের কোন অস্তিত্ব ছিলাে না, এমনটা আমরা দাবী করতে পারি না ! বর্তমানে আমরা বৃহস্পতি গ্রহের অনেক অনেক উপগ্রহ দেখতে পাই অধিকতর শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে। এখন, ঈশ্বর হলেন একটা ধারনা যেটা ক্ষুদ্র কনা বা তরঙ্গের ধারনার চাইতেও অনেক সুক্ষ্ম । যে যন্ত্রপাতিগুলাে আমরা ব্যবহার করি এবং জ্ঞান অর্জন করি সেগুলাে শুধুমাত্র নিরীক্ষন করতে পারে ও পরিমাপ করতে পারে বস্তুগত বিষয়গুলােকে, খুব বেশি হলে ক্ষুদ্রকনা ও তরঙ্গকে। ঠিক যেমন, টেলিফোন সংযােগের মাধ্যমে দিল্লীতে বসে নিউইয়র্কে থাকা একটি গােলাপের গন্ধ শুকার প্রচেষ্ঠা একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত, একইভাবে বস্তুগত যন্ত্রপাতি দ্বারা ঈশ্বরকে নিরীক্ষা করা ও পরিমাপ করার চেষ্টা করাটা এক কথায় অপচয়।

প্রশ্ন- যদি এটাই হয়, তবে কেন আধুনিক বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে? 
→আধুনিক বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না। কিন্তু এই বিষয়টি আধুনিক পদার্থ বিদ্যার আওতার বাইরে। নিউটন, আইনস্টাইন ইত্যাদি সকল মহান বিজ্ঞানীদের জীবনী পড়ুন। কেউই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন নি। বাস্তবে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত ঈশ্বর বিশ্বাসী। আধুনিক বিজ্ঞান ঈশ্বরের সেই সকল বৈশিষ্ট্যগুলােকে অস্বীকার করে যেগুলাে যুক্তি, প্রমানিত নিরীক্ষন ও গবেষনা বিরােধী। ইউরােপে আধুনিক বিজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটেছে আস্তিকতার ধারনার প্রতিক্রিয়ায়। যা হােক, নতুন নতুন গবেষনা সংগঠিত হচ্ছে। অনেক অনেক ধারনার আসল সত্য প্রকাশ হচ্ছে। এই বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে যেমন আধুনিক বিজ্ঞান বাইবেলীয় ঈশ্বর দর্শনকে বাতিল করে দিয়েছে তার বস্তুনিষ্ট গবেষনার যাত্রাকে চলমান রাখতে। আর তখনই ঈশ্বরকে বাতিল করার বিষয়টি আধুনিক বিজ্ঞানের আলােচনার বিষয় হয়ে ওঠে যখন আধুনিক বিজ্ঞান সবচেয়ে বেশি প্রতিরােধের সম্মুখীন হয় ভক্ত সম্প্রদায় ভিত্তিক রক্ষনশীল খ্রিস্টান ও ইসলাম থেকে, এবং তাই (খ্রিস্ট ও ইসলামী মতবাদের) ঈশ্বরকে বাতিল করাটা হয়ে উঠেছে আধুনিক বিজ্ঞানের বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য। সাধারন কথায় আধুনিক বিজ্ঞান ঈশ্বরকে বাতিল করেছে যার কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু  আধুনিক বিজ্ঞান ইহা কখনোই বাতিল করেনি যার অস্তিত্ব কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না বা সম্ভব না।
.
প্রশ্ন- অস্তিত্ব নেই এমন ঈশ্বর বলতে আধুনিক বিজ্ঞান কি বুঝিয়েছেন? 
→ঈশ্বর যিনি বৈশিষ্ট্য ও আচরনে মানুষের মত। . ঈশ্বর যিনি সর্বভুতে বিরাজমান অবস্থিত নন। ঈশ্বর যার নির্দিষ্ট আকার আছে। ঈশ্বর যিনি হস্তক্ষেপ করেন লােকজনের প্রতিদিনকার বিষয়গুলােতে। ঈশ্বর যিনি সময়সুযােগে অলৌকিক ঘটনা ঘটান। ঈশ্বর যিনি তাঁর অনুসারীদের পাপকে ক্ষমা করেন। ঈশ্বর যিনি আমাদের কে স্বর্গে ও নরকে পাঠান। ঈশ্বর যিনি তাঁর বার্তাবাহক, নবী বা অবতার পাঠান। ঈশ্বর যিনি পরিবর্তন হন এমনকি সামান্য হলেও। ঈশ্বর যিনি চতুর্থ বা সপ্তম আকাশে অবস্থান করেন।
.
ঈশ্বর যিনি কোন নির্দিষ্ট বই বিশ্বাস না করার জন্য শাস্তি দেন। ঈশ্বর যিনি জগতের শেষ বা ধ্বংসের পরে বিচার দিবসের জন্য অপেক্ষা করেন।  ঈশ্বর যিনি জগতকে সৃষ্টি করেছেন কয়েক ঘন্টা বা দিনে।  ঈশ্বর যিনি দেবদূতদের সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বর যিনি কোন শয়তানের সাথে যুদ্ধ করেন। ঈশ্বর যার এই ধরনের বৈশিষ্ট্য আছে এককথায় তাঁর কোনাে অস্তিত্ব নেই। বেদ অথবা
আধুনিক বিজ্ঞান এটি বিশ্বাস করেনা কারন এটি যুক্তি বিরােধী।
.
প্রশ্ন- কিভাবে আমরা ঈশ্বরের লক্ষনগুলাে বুঝব? 
→তিনটি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগত দিক বিশ্লেষন ও নিরীক্ষনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের লক্ষনগুলাে বুঝতে পারব।
.
প্রশ্ন প্রথম দিক কোনটি? 
→মহাবিশ্বের নিয়মঃ শুধুমাত্র ভাবুন, একটি আইন বা নিয়মবিধি আসলে কি? যেকোন ব্যাক্তি বা বস্তু যেটা যথাযথভাবে পুনরায় পুনরায় একই ঘটনা ঘটানাের প্রদর্শন করে এটাই আইন বা নিয়ম। তাই এখানে প্রশ্নটা আসে, কে বা কি এই নিয়মগুলােকে কার্যকর করছে ? অন্যভাবে বললে, যদি মহাকর্ষ শক্তি, তড়িৎচুম্বক শক্তি, শক্তিশালী ও দুর্বল বল এই চারটি মৌলিক শক্তি যদি এই জগতকে নিয়ন্ত্রন করে, তবে এটার পিছনে মূল কারনটা কি ? পদার্থবিদরা এগুলােকে একত্রিত করতে ব্যার্থ হয়েছেন। কিন্তু বলছেন ভবিষ্যতে সফল হবেন। আচ্ছা মনে করি আমরা এই শক্তিগুলােকে ঐক্যবদ্ধ শক্তি বললাম। এখন আমার প্রশ্নটা হবে "এই ঐক্যবদ্ধ বলের উৎসটা কি?" এই ঐক্যবদ্ধ শক্তি বা শক্তিগুলাে আরােপিত হবে ঈশ্বরের প্রতি (অর্থাৎ এই শক্তিগুলাে তাঁর) । তাই ঈশ্বর এই শক্তিগুলাে এতই যথাযথভাবে চালনা করছেন যে আমরা এটা পরিমাপ করতে পারছি, তারপর আমরা এটাকে "আইন" হিসেবে নিতে পারছি। তাই ঈশ্বর হলেন সেই সত্তা যিনি এই জগতকে পরিচালনা করছেন।
.
প্রশ্ন- দ্বিতীয় দিক কোনটি? 
চেতনাঃ দ্বিতীয় দিক আসে চেতনা থেকে। আধুনিক বিজ্ঞান চেতনার উৎস খুজে পেতে ব্যার্থ হয়েছে । এটা জানায় যে একটা মানব/প্রাণী দেহ ভালােভাবে কাজ করে, প্রায় অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায়। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিটা কিভাবে চালু থাকে? কিভাবে এটি প্রথম স্থানে আসে? তাদের সকলকে হতবুদ্ধি করে দেয়। এছাড়াও, ব্যাথা ও আনন্দের উৎস যেটা বিস্ময়কর মনস্তুাত্তিক বিষয়ের উৎস এটা এমনকিছু যেটা আধুনিক বিজ্ঞান পরিমাপ করতে অক্ষম হয়নি কারন এর যন্ত্রপাতিগুলাে ক্ষুদ্রাংশ এর তুলনায় অধিক সুক্ষ্মতর হতে পারে না। এবং এই চেতনা এর চেয়ে বেশি সুক্ষ্ম । রাসায়নিক বিক্রিয়া চেতনাকে ব্যাখ্যা করতে পারেনা। এই বিষয়ের উপর যে কোন আধুনিক বই পড়ুন আপনি জানতে পারবেন এটি আধুনিক বিজ্ঞানকে এড়িয়ে যায়। এখন তারা বলে যে চেতনা সমগ্র ব্যবস্থাটায় (অক্ট্রনিহীত) রয়েছে এবং এটি মস্তিষ্কের যেকোন একটি অংশে অবস্থিত নয় । কোন বিষয়টি প্রাণী বা মানুষের ব্যথার অনুভুতি জাগায় এবং কোন নিউরনগুলাে সিদ্ধান্ত নেয় উদ্দীপিত করতে এবং কখন, এটা এখন পর্যন্ত আধুনিক বিজ্ঞানের আওতার বাইরে কিভাবে মস্তিষ্ক কাজ করে, এবং কিভাবে বৈদ্যুতিক সংকেত সক্রিয়তায় পরিবর্তন হয়, এবং কোনটি আমাদেরকে বিভিন্ন আবেগ অনুভুত করায় এবং কে এই আবেগ অনুভব করে, এই প্রশ্নগুলাে আছে যেগুলাের কোন উত্তর আধুনিক বিজ্ঞান দিতে পারে না। একজন বিখ্যাত নিউরােসার্জন দ্বারা পরিচালিত) Human Body Mind Power নামক বিবিসির একটি ডকুমেন্টারীতে তিনি স্বীকার করেন যে আমরা যাকে চেতনা বলি সেটি আত্মাকে ইঙ্গিত করে।
বেদ অনুসারে, এই সত্তা যা ব্যথা। আনন্দ অনুভব করে তা হলাে আত্মা। যে সত্তা চেতনা এবং চেতনাহীনদের (প্রাণহীনদের) পরিচালনা করেন তিনি হলেন ঈশ্বর । কারণ ঈশ্বর চেতন সত্তাগুলােকে পরিচালনা করেন, ঈশ্বরও চেতন। যেহেতু ঈশ্বর এবং আত্মা বস্তুগত বা দৈহিক সত্তার চেয়ে সূক্ষ্ম, তাই তারা অবিনশ্বর এবং তাই জন্মহীন এবং মৃত্যুহীন । কিন্তু এইটি অপরদিকে তাদেরকে তাদের অপরিমাপযােগ্য বা অনিরীক্ষনযােগ্য করে তােলে।
.
প্রশ্ন -আচ্ছা ঠিক আছে,তৃতীয় দিকটি কি? 
→মাতৃগর্ভে থাকা বাচ্চাঃ মাতৃগর্ভে থাকা বাচ্চা এমনকি শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারে না। এটা তার খাবার, বাতাস সকলকিছু পায় নাভিরজ্জ্বর মাধ্যমে। এবং এটি এমন একটা পদ্ধতিতে বিকশিত হয় যখন সে গর্ভের বাহিরে আসে ব্যবস্থাটা ইতােমধ্যেই তৈরী থাকে তার কার্যক্রমগুলােকে সহায়তা করতে যেমন নিঃশ্বাস নেওয়া, হৃদপিন্ড-ফুসফুস প্রক্রিয়া ইত্যাদি । কিভাবে এমন একটি 'ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বিকাশ লাভ করেছে ? সর্বত্র পরিব্যাপ্ত সচেতন সত্তা সকল কিছুতে এটি পরিকল্পনা করেছেন, এটি মেনে নেয়া ছাড়া এটার কোন ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। প্রাণের এবং জগতের যেকোনাে দিকের বিশুদ্ধ বিশ্লেষণের ফলে (এই জ্ঞান) অর্জিত হবে যে এটা কেবল এলােমেলােভাবে ঘটছে এমন কোনাে রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়। এই সকলকিছু অবশ্যই একটি পরম চেতন শক্তি পরিচালনা করছেন।
.
প্রশ্ন- ঠিক আছে, ঈশ্বর আছেন এই আইডিয়াটা আমি পেয়েছি। কিন্তু আমি কিভাবে ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করব?
→তুমি ঈশ্বরকে অনুধাবন করতে পার প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ ইঙ্গিতে।
.
প্রশ্ন- কিন্তু সরাসরি ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব নয়। তাহলে তুমি কিভাবে ঈশ্বরকে (ঈশ্বরের ধারনাকে) প্রতিষ্ঠিত করবে ? 
→প্রমাণের অর্থ ইন্দ্রিয় অঙ্গগুলি থেকে প্রাপ্ত উদ্দীপনার মাধ্যমে নির্ধারিত সুস্পষ্ট জ্ঞান। তবে লক্ষ্য করুন যে ইন্দ্রিয়গুলি বৈশিষ্ট্য, গুন, ধর্মগুলি ধরতে পারে কিন্তু "এই বৈশিষ্ট্যগুলির কারণকে" ধরতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যখন এই পোস্টটি পড়ছেন, তখন আপনি নিশ্চয়ই বৈদিক ধারণা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করছেন (যাকে বলা হয় ধারণ করা) , শুধুমাত্র কিছু ছবি আপনার স্ক্রীনে পৃষ্ঠায় আসছে যা আপনি অর্থপূর্ণ জ্ঞানের মাধ্যমে ধারণ করছেন। এবং তারপর আপনি উপসংহারে আসলেন এবং ভাবছেন পোস্টটির কোনাে না কোনাে লেখক আছেই তৎপর আপনি দাবি করলেন  অস্তিত্বের প্রমাণ আছে । তাই এটি হলাে 'পরােক্ষ প্রমান। যদিও এটিকে প্রত্যক্ষ বলা হয় কারণ আপনি যা দেখেন সেটাই হল প্রত্যক্ষ, কিন্তু যা শুধুমাত্র অনুভব করা যায় ও ধারণ করা যায় সেটা হলো পরোক্ষ ।
.
একইভাবে এই পুরাে সৃষ্টি যা আমরা দেখা এর বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলাে দ্বারা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ইঙ্গিত করে। যখন আপনি একটি ইন্দ্রিয় সংক্রান্ত ইনপুট কোন একটি বিষয়ের সাথে সরাসরি সংযােগ করতে পারবেন, তখন "সরাসরি প্রমাণ আছে" আপনি এমন দাবি করবেন। উদাহরণস্বরূপ, যখন আপনি একটি আম খান, তখন আপনি মিষ্টির বৈশিষ্ট্যকে অনুভব করেন এবং এটিকে আমের সাথে জুড়ে দেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলাে আপনি এমন "প্রত্যক্ষ প্রমানের" সহযােগী হন শুধুমাত্র ঐ বিশেষ ইন্দ্রিয় দ্বারা যেটি ঐ বৈশিষ্ট্যকে নিরীক্ষন করেছে। এভাবেই পূর্বের উদাহরণ থেকে বলা যায় আপনি শ্রবনেন্দ্রিয় বা কানের মাধ্যমে আমের প্রত্যক্ষ প্রমান পাবেন না, আমের প্রত্যক্ষ প্রমান পাবেন শুধুমাত্র জিহবা, নাক বা চোখ দিয়ে। এখন, ঈশ্বর যেহেতু সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিদ্যমান সত্তা, তাই চোখ, নাক, জিহ্বা, ত্বক বা কান মত মােটা ইন্দ্রিয়ের অঙ্গগুলির মাধ্যমে ঈশ্বরের 'সরাসরি প্রমাণ পাওয়া অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ আমরা এমনকি অত্যন্ত শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমেও অতিআনবিক কণা দেখতে পাচ্ছি না, আমরা অতিস্বনক শব্দ (ultrasonic sound) শুনতে পাই না এবং আমরা প্রতিটি অণুর স্পর্শ অনুভব করতে পারি না। অন্য কথায়, এই অস্পষ্ট ও দুর্বল ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ঈশ্বরকে প্রমাণ করা অসম্ভব, ঠিক যেমন শ্রবনেন্দ্রিয় বা কানের মাধ্যমে আমকে অনুভূত হতে পারেনা বা সাবটোমিক কণা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয় না আমাদের কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা।
.
প্রশ্ন- এমন কোন পথ আছে কি যাতে আমরা সরাসরি ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি? 
→ঈশ্বরকে অনুভব করতে পারে একমাত্র যে ইন্দ্রিয়, তা হলাে মন । যখন মন পুরােপুরি নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিক্ষোভমুক্ত থাকে (সব সময় হাজার হাজার ভাবনা আসছে) এবং ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অধ্যয়ন ও অনুশীলনের মাধ্যমে প্রাপ্ত করা হয়, ঈশ্বর প্রত্যক্ষভাবে প্রমানিত হতে পারে বুদ্ধির মাধ্যমে, সেই একই ভাবে যেমনটা এটা আমের স্বাদের প্রমান পেয়েছিলাে। ঈশ্বরকে অনুধাবন করা জীবনের লক্ষ্য, এবং একজন যােগী এটাই করার উদ্যোগ নেয় মনকে নিয়ন্ত্রন করার নানা কৌশলের মাধ্যমে, যেখানে কিছু বিষয় অনুশীলন করা অন্তর্ভুক্ত থাকে যেমন অহিংসা, সত্যান্বেষা, ধৈৰ্য্য, সকলের জন্য শান্তি অন্বেষন, উচ্চ মানবিক চরিত্র, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, মনুষ্যগনের মধ্যে একতা ইত্যাদি। একটি উপায়ে, প্রতিদিন আমরা আমাদের জীবনে ঈশ্বরের সরাসরি প্রমাণ ইঙ্গিত পাই । যখন আমরা চুরি, প্রতারণা, নিষ্ঠুরতার মতাে কোনও ভুল কাজ করতে চেষ্টা করি, তখন আমরা ভয়, লজ্জা, সন্দেহের আকারে সেই অস্পষ্ট ভেতরের নির্দেশ' শুনতে পাই। এবং যখন আমরা অন্যকে সাহায্য করার মতাে মহান কাজে নিয়ােজিত থাকি, একটি শিশুকে আশীর্বাদ করি, তখন আমরা আবার সেই 'ভেতরের নির্দেশ' শুনতে পাই ভয়হীন, সন্তুষ্টি, উৎসাহ এবং সুখের অনুভুতির আকারে। এই 'ভিতরের নির্দেশ' ঈশ্বর থেকে আসে। প্রায়শই আমরা এটির শ্রুতিগ্রাহ্যতা হ্রাস করি চারপাশের বােকা প্রবণতার উচ্চশব্দের DJ মিউজিকের মাধ্যমে এই নির্দেশনাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপর আমরা সকলে, সময়ে সময়ে, অনুভব করি এই 'ভেতরের নির্দেশ' আরাে জোরালাে হচ্ছে এবং তখনই এটা হয় যখন চারপাশ তুলনামূলক ভাবে নীরব থাকে। এবং যখন ব্যাক্তি নিজেই নিজেকে মানসিক বিক্ষিপ্ততা থেকে শুদ্ধ করেন এবং DJ ক্লাব থেকে দূরে চলে যায়, এই ব্যাক্তি নিজেই নিজের কাছে প্রত্যক্ষ প্রমান পেতে পারে সেই সাথে ঈশ্বরকেও প্রমাণ করতে পারে। অতএব, প্রত্যক্ষ এবং পরােক্ষ উভয় প্রমাণের মাধ্যমে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্পষ্টরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যেমনভাবে অন্য সত্তাগুলাে আমাদের দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ হয়েছে।
.
প্রশ্ন- ঈশ্বর কোথায় বাস করেন?
→ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান অতএব তিনি সব জায়গাতেই আছেন । যদি ঈশ্বর কোন একটা বিশেষ স্থানে যেমন কোন বিশেষ আকাশে অথবা কোন বিশেষ আসনে বাস করেন, তিনি তবে সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, সকল কিছু পরিচালনাকারী, সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং ধ্বংসকর্তা হতে পারবেন না। আমরা কোন স্থানে উপস্থিত না থেকে সে স্থানের কর্মগুলাে সম্পাদন করতে পারব না।
.
প্রশ্ন- ঈশ্বর কি একস্থানে থেকে জগতকে পরিচালনা করছেন না ঠিক যেমন সূর্য অনেক দূর থেকে পৃথিবীকে আলােকিত করছে? 
→ঈশ্বর একস্থানে থেকে জগতকে পরিচালনা করছেন ঠিক যেমন সূর্য অনেক দূর থেকে পৃথিবীকে আলােকিত করছে অথবা যেমন আমরা রিমােটের মাধ্যমে টিভিকে নিয়ন্ত্রন করি এগুলাে ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি। কারন সূর্য পৃথিবীকে আলােকিত করতে পারে বা রিমােট কন্ট্রোল টিভিকে চালনা করতে পারে বিকিরন তরঙ্গের মাধ্যমে যেটা অন্তবর্তী মহাশূণ্যের মধ্যে ভ্রমন করতে পারে। শুধুমাত্র আমরা এটাকে দেখতে না পাওয়ায় আমরা রিমােট কন্ট্রোল বলি। বাস্তবে রিমােট কন্ট্রোলের মতন কিছু নেই। তাই, বাস্তবতাটি হলাে ঈশ্বর পরিচালনা করতে পারেন, এর দ্বারা বােঝায় তিনি সেখানে উপস্থিত থাকেন এটিকে পরিচালনা করতে। উপরন্তু, ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন কেন তিনি নিজেকে একটি ছােট স্থানে সীমাবদ্ধ রাখবেন? ঈশ্বর যদি নিজেকে সীমিত করেন, এটি ঈশ্বরকে সীমাবদ্ধ করে তােলে। খ্রিস্টানরা বলে যে ঈশ্বর চতুর্থ আকাশে আছেন এবং মুসলমানরা বলে যে আল্লাহ সপ্তম আকাশে আছেন। এবং তাদের অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের সঠিক প্রমাণ করার জন্য। এটা কি এমন যে, গড় ও আল্লাহ আলাদা আলাদা বাস করার সিদ্ধান্ত নিলেন, যাতে তাঁরা তাদের রাগান্বিত অনুগামীদের মত যুদ্ধে না জড়িয়ে পরেন? প্রকৃতপক্ষে, এইগুলাে বালকসুলভ আলােচনা। যেখানে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান এবং সমগ্র মহাবিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন কোন কারণ নেই যে তিনি নিজেকে মহাবিশ্বের একটি ছােট অংশে সীমিত করে ফেলবেন। এবং যদি তিনি তা করেন, তিনি সর্বশক্তিমান রূপে বর্ণিত হতে পারেন না।
.
প্রশ্ন- এটা কি বােঝায় ঈশ্বর নােংরা জিনিস যেমন এলকোহল, প্রস্রাব ও মলমূত্রেও আছেন? 
→সমগ্র সৃষ্টি ঈশ্বরের মধ্যেই আছে। ঈশ্বর এই জিনিসগুলির বাইরেও আছেন, কিন্তু এই জিনিসগুলি ঈশ্বরের বাইরে বিদ্যমান নেই । অতএব, বিশ্বের সব কিছু ঈশ্বরের দ্বারা পরিব্যাপ্ত। একটি মােটামুটি উপমা দিতে গেলে, আমরা ঈশ্বরের মধ্যে আছি ঠিক যেমনভাবে জলের একটি পাত্রের মধ্যে কাপড়ের একটি টুকরা থাকে। কাপড়ের ভেতরে, বাহিরে এবং সর্বত্র জল আছে । কাপড়ের এমন কোনও অংশ নেই যা শুকনাে বা জল দিয়ে ভেজা নয়, তবে কাপড়ের পাশাপাশি জল কিন্তু বাইরেও আছে। কোনাে কিছু আমাদের জন্য নােংরা বা ভাল সেটি নির্ভর করে এটির প্রতি আমাদের দায়িত্ব কেমন তার উপর। সেই একই অণুর সেট মজাদার আম গঠন করে, তা আমরা খাই এবং যখন নানাভাগে বিভক্ত হয়ে যায় ও অন্য রাসায়নিক পদার্থের সাথে ক্রিয়া করে এবং মলমুত্র গঠন করে, তখন সেটা আমাদের জন্য নােংরা হয়ে যায় । কিন্তু মূলত, এই সমস্ত কিছু নিছকই প্রকৃতির কণার বিভিন্ন মাত্রার সংমিশ্রণ। যেহেতু আমাদের এই পৃথিবীতে একটি মিশন আছে, আমরা প্রতিটি জিনিস বিশ্লেষণ করি মিশনের সহিত সঙ্গতি রেখে এবং কিছু গ্রহণ করি বাকীটা প্রত্যাখ্যান করি। আমরা প্রত্যাখ্যান করি যা আমাদের জন্য নােংরা, বা আবর্জনা, এবং আমরা গ্রহন করি আমাদের জন্য যা ভাল । কিন্তু ঈশ্বরের জন্য, এই ধরনের করনীয় কিছু নেই এবং অতএব, তার জন্য কিছুই নােংরা নয়। বিপরীতভাবে, তাঁর কর্তব্য আমাদের থেকে আলাদা, যাতে আমাদেরকে সহায়তা করা যাতে আমরা যথাযথভাবে আনন্দ অর্জন করতে পারি এবং তাই তাঁর সমগ্র সৃষ্টিতে তাঁর জন্য অস্পৃশ্য কিছুই নেই।
যদি আপনি অন্য দৃষ্টান্তের দিকে তাকান, তবে ঈশ্বর একজন আদুরে সমাজকর্মীর মতাে নন, যিনি এয়ার কন্ডিশনাল অফিসে বসে দূরবর্তী অবস্থানের পরিকল্পনা করতে পছন্দ করেন কিন্তু যে বস্তিতে প্রকুত সামাজিক কাজ সম্পন্ন করতে হবে সেগুলি পরিদর্শন থেকে বিরত থাকবেন। বিপরীতে তিনি, আমাদের উপকারের জন্য নােংরাতম জায়গা পরিচালনা করতে বিদ্যমান থাকেন। এবং যেহেতু তিনি একা সবচেয়ে নিখুঁত, যদিও তিনি সর্বত্র আছেন এবং তাঁর মধ্যেই সবকিছু আছে, তা সত্ত্বেও তিনি শুধুমাত্র পরোক্ষ
.
প্রশ্ন- ঈশ্বর কি দয়ালু বা ন্যায় বিচারক? 
→ঈশ্বর দয়া ও ন্যায়বিচারের উপমা।
.
প্রশ্ন- কিন্তু এইটা বিপরীত বৈশিষ্ট্য হল উদারতা মানে একজন অপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং ন্যায়বিচার মানে অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করা। উভয় বৈশিষ্ট্য কিভাবে একই সাথে বিদ্যমান হতে 
পারে ? 
→দয়া এবং ন্যায়বিচার এক এবং একই কারণ উভয়েই একই উদ্দেশ্য সাধন করে। দয়া করা অর্থ অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়া বােঝায় না। কারণ যদি অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়, অনেক নির্দোষ মানুষ তার শিকার হয়ে যাবে। সুতরাং, যদি কোন অপরাধীকে বিচার না করা হয়, তবে একজন বিচারক নির্দোষ ব্যক্তিদের পক্ষে দয়ালু হতে পারবেন না। এটা অপরাধীদের জন্য ন্যায়বিচারও হবে না কারণ তাতে সেই অপরাধী আরও অপরাধ করা থেকে বিরত থাকবে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি ডাকাতকে ক্ষমা করে দেয়া হয়, তবে সে বেশ কিছু নির্দোষ ব্যক্তিদের ক্ষতি করবে। এবং যদি তাকে কারাবন্দী করা হয়, তবে এটি কেবল নির্দোষদের ক্ষতি করা রুখে দেবে শুধু সেটিই নয় আরাে বরং তাকে নিজেকে উন্নত করার সুযােগ দেবে এবং সে আর অপরাধ করবে না। তাই ন্যায় বিচার প্রত্যেকের এবং সকলের জন্য দয়াতেই কেবলমাত্র নিহীত থাকে। প্রকৃতপক্ষে, দয়াশীলতা ব্যাপারটি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে এবং ন্যায়বিচার ব্যাপারটি প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। যখন ঈশ্বর একজন অপরাধীকে শাস্তি দেন, তিনি সেটা করেন অপরাধীকে আরাে অপরাধ করা থেকে প্রতিরােধ করতে । এবং তিনি নির্দোষ মানুষকে তাদের কোন অপরাধ ছাড়াই শাস্তি পাওয়া থেকে রক্ষা করেন। এভাবে, ন্যায়বিচারের সকল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সকলের প্রতি দয়া।
.
বেদ অনুযায়ী, এবং গবেষনা অনুযায়ী, দুঃখের উৎস হল অজ্ঞতা যা একজন ব্যাক্তিকে "অপরাধ' নামক ভুল কাজ করায়। তাই যখন একজন ব্যাক্তি এইরকম অন্যায় কাজ করে, তখন ঈশ্বর তার স্বাধীনতার উপর নিয়ন্ত্রণ আরােপ করেন এবং তার অজ্ঞতা দূর করার এবং দুঃখ মুছে ফেলার সুযােগ করে দেন। শুধুমাত্র "সরি" বলাটা ঈশ্বরের ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য যথেষ্ট না। পাপ বা অপরাধের উৎস অজ্ঞতা। এবং যতক্ষন পর্যন্ত অজ্ঞতা দূর করা যাচ্ছে না, আত্মা তার কর্মের জন্য যথাযথ শাস্তি বা পুরষ্কার পেতে প্রতি মুহুর্তে বিভিন্ন জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে যাবে। এই ন্যায়বিচারের সকল উদ্দেশ্য হল আত্মাকে পরমানন্দের উপহার প্রদান করা এবং এটাই সেই আত্মার প্রতি তার দয়াশীলতা।
তার মানে কি ঈশ্বর পাপ ক্ষমা করবেন না? যদি তা হয়, ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম আরও ভাল। সেখানে যদি আমি স্বীকার করি বা দুঃখিত বলি, আমার সমস্ত অতীতের রেকর্ড মুছে ফেলা হয়, এবং আমি নতুন সুযােগ পাই। ঈশ্বর পাপ ক্ষমা করেন। তাঁর ক্ষমা নিহীত আছে আমাদের কর্মের সঠিক ফলাফলের উপর, যা তিনি দিয়েছেন এবং আপনার অতীতের রেকর্ডগুলি মুছে দেওয়ার মধ্যে (ক্ষমা নিহীত) নয়।
.
 যদি তিনি আমাদের অতীতের রেকর্ডগুলি মুছে ফেলতেন, তবে তিনি আমাদের কাছে সবচেয়ে অবিচার ও নিষ্ঠুরতা করতেন । কারণ এই ক্ষেত্রে, তিনি আমাদেরকে পরবর্তী শ্রেণীতে উন্নীত করার অনুমতি দিয়েছেন, এমনকি যখন আমরা বর্তমান শ্রেণীর পাস করার যােগ্যতাই অর্জন করতে পারিনি। এবং এই প্রক্রিয়াতে, তিনি অন্যদের সাথে অবিচার করেন যারা আমাদের সাথে পারস্পরিকভাবে সক্রিয়। ক্ষমা করা মানে আপনার যােগ্যতা উন্নত করার সুযােগ প্রদান করা এবং আপনাকে ১০০% নম্বর দেওয়া নয় যখন আপনি শূন্য পাওয়ার যােগ্যতা অর্জন করেন। এবং ঠিক এটাই ঈশ্বর করেন। এবং মনে রাখবেন, যােগ্যতার উন্নতি এক মুহূর্তে বা 'দুঃখিত এই এক শব্দ দ্বারা ঘটতে পারে না ।
.
 এটি একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে আত্মনিয়ােজিত অনুশীলন এবং প্রচেষ্টার দাবি করে। শুধুমাত্র অলস লােক সংক্ষিপ্ত পথ খোঁজে চাইতে যেমন অনেকে পড়াশুনা ছাড়াই শতভাগ নাম্বার পেতে চায়। দুর্ভাগ্যবশত, যারা তাদের ধর্মের দিকে মানুষকে এই বলে আকর্ষনের চেষ্টা করে যে - ঈশ্বর তাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন, তারা আসলে নিজেদের এবং জনগণকে বােকা বানাচ্ছেন। ধরুন কারাে ডায়াবেটিস আছে। এটা কি শুধু 'দুঃখিত' বললেই দূর হয়ে যায়? যখন একটি শারীরিক রােগকে মুক্ত করতে 'দুঃখিত' বলার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করা লাগে, কিভাবে মানব মনের মত একটা জটিলতর বিষয়ের ক্ষেত্রে 'দুঃখিত' বললেই মুক্ত হয়ে যায়? এই (আব্রাহামিক) মতাদর্শগুলােতে একটি বিরাট ত্রুটি আছে, তারা এক জীবনে বিশ্বাস করে এবং পুনর্জন্ম বা জন্মান্তরে বিশ্বাস করেনা । তাই তারা মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য কৃত্রিম 'সংক্ষিপ্ত তাড়াতাড়ি সূত্র তৈরি করতে চায় এবং মানুষরা তাদের সাথে একমত না হলে তারা তাদেরকে নরকের ভয় দেখায়।
.
বৈদিক দর্শন অনেক বেশি স্বাভাবিক, যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায্য। সেখানে না আছে এমন কোন জাহান্নাম যেখানে আপনি চিরকালের জন্য জ্বলতে, আল্লাহ্ (যিনি মায়ের মতাে প্রেমময়) কর্তৃক নিক্ষেপিত হবেন, আর না তিনি আপনাকে আপনার প্রাপ্য সেই সুযােগ থেকে বিরত করেন- যেটাতে আপনি প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে আপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন সবশেষে, কোনটি অধিকতর সন্তোষজনক? জাল মার্ক শীটের মাধ্যমে প্রথম স্থানটি অধিকার করা ? যেখানে আমরা জানি যে প্রকৃতপক্ষে আমরা শূন্য পেয়েছিলাম? না কি। কঠোর পরিশ্রমে এবং মধ্যরাতের তেল জ্বালানাের মধ্য দিয়ে গর্বিত প্রথম স্থান অধিকার করা ? যেখানে আমরা জানি যে আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি বিষয়টিতে স্নাতােকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করতে! সুতরাং বলা যায় বেদে, সাফল্যের জন্য কোন সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘমেয়াদি পথ নেই। শুধুমাত্র সঠিক পথ আছে! এবং কোনও বিভ্রান্তিকর এবং প্রতারনাপূর্ণ সংক্ষিপ্ত পথের চেয়ে এই সাফল্য অনেক বেশি সন্তুষ্টকর!
.
প্রশ্ন- ঈশ্বর কি সাকার না নিরাকার? 
→বেদ ও সাধারণ জ্ঞান অনুযায়ী তিনি নিরাকার। যদি তার একটি আকার থাকতাে তবে তিনি সর্বত্র বিরাজমান হতে পারতেন না, কারণ আকার একটা নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ অস্তিত্বকে সূচিত করে। এবং তাই, সেক্ষেত্রে (অর্থাৎ সাকার হলে) তাঁর অস্তিত্ব নির্দিষ্ট সীমানার পরে থাকা উচিত নয়। ঈশ্বরের আকার শুধুমাত্র দেখা যাবে যদি তিনি স্থল হন, কারন আলােক তরঙ্গকে প্রতিফলিত করতে পারে এমন কোনাে বস্তুর চেয়ে কোন বস্তু সুক্ষ্ম হলে সে সুক্ষ্ম বস্তুটিকে আর দেখা যায় না। এখন বেদ স্পষ্টভাবে বলে ঈশ্বর সুক্ষ্মতম, ফাঁকহীন এবং সমভাবে সর্বব্যাপী। অতএব, তাঁর কোনাে আকার থাকতে পারে না। যদি ঈশ্বরের একটি আকার থাকে, তার মানে কেউ তার আকার তৈরী করেছেন। কিন্তু এটা সম্ভব নয়।
.
প্রশ্ন- ঈশ্বরের কি কোন শুরু আছে?
→ঈশ্বরের কোন প্রারম্ভ এবং শেষ নেই। তিনি সব সময় উপস্থিত ছিলেন এবং সব সময় উপস্থিত থাকবেন। উপরন্তু তার বৈশিষ্ট্য সব সময় একই থাকে। আত্মা ও প্রকৃতি এই দুইটি শুরুহীন ও শেষহীন সত্তা।
.
প্রশ্ন-ঈশ্বর কি চান?
→ ঈশ্বর সব আত্মার জন্য আনন্দ চান এবং তারা যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে যথোপযুক্ত ভাবে যথাযথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সুখ অর্জন করে ঈশ্বর সেটাই চান।
.
প্রশ্ন- যেহেতু ঈশ্বরের অঙ্গ এবং ইন্দ্রিয় নেই তাহলে তিনি কিভাবে তার কর্ম পরিচালনা করেন?
→যেহেতু এই কর্মগুলাে অণুবীক্ষণিক স্তরে ঘটে, তাই তাঁর (ঈশ্বরের) কর্মের জন্য স্থল (পার্থিব অঙ্গের প্রয়ােজন নেই। তিনি তাঁর সহজাত ক্ষমতার মাধ্যমেই তা করেন। তিনি দেখেন চক্ষু ছাড়াই, কারণ তার চোখ মহাশূণ্যের প্রতিটি স্থানে উপস্থিত থাকে, তাঁর পা নেই, কিন্তু তিনি দ্রুততম, তাঁর কান নেই, কিন্তু সবকিছুই শােনেন, তিনি সবকিছুই জানেন কিন্তু তিনি সকলের সম্পূর্ণ জ্ঞানাতীত। এই শ্লোক উপনিষদ থেকে এসেছে। ঈশােপনিষদ এই বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে।
.
প্রশ্ন- ঈশ্বর কি তাঁর সীমা সম্পর্কে জানেন? 
→ঈশ্বর সবকিছু জানেন। এর মানে যা সত্য তিনি তা জানেন । যেহেতু ঈশ্বর সীমাহীন, তিনি নিজেকে সীমাহীন হিসাবে জানেন। এটা তাঁর জন্য অজ্ঞতার পরিচয়বাহী হবে, যদি তিনি তাঁর সীমাকে জানার চেষ্টা করেন যখন কোনকিছুর অস্তিত্ব ছিলাে না।
.
প্রশ্ন- ঈশ্বর কি সগুন বা নির্গুণ? 
→ঈশ্বর সগুন, যদি আপনি ঈশ্বরের দয়াশীলতা, ন্যায় বিচারক, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যকে উল্লেখ করেন। কিন্তু তিনিই নির্গুণ যখন আপনি উল্লেখ করেন যে, মুর্খতা, জ্ঞানহীনতা, ক্রোধ, প্রতারণা, জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতির অধিকারী তিনি নন। এটি শুধুমাত্র একটি শব্দার্থগত পার্থক্য।
.
প্রশ্ন- কিছু পণ্ডিতরা বলছেন যে ঈশ্বর কর্ম করেন না এবং তার কোনও সম্পত্তি নেই। যা ঘটছে। তিনি শুধুমাত্র তার সাক্ষী হন এবং তাঁর পরিকল্পনা করা আইনের মাধ্যমে জগত পরিচালিত হচ্ছে ?
→ঈশ্বর সবচেয়ে গতিশীল সত্তা। এবং তার সম্পত্তি অসীম। যাইহােক, তার সক্রিয়তা এটা বােঝায় না যে তিনি নিজে পরিবর্তন করেন, কিন্তু তিনি সব কর্মের উৎস। আইন হিসাবে আমরা যা বলছি তা হলাে আসলে ঈশ্বর খুব নিখুঁত পদ্ধতিতে কর্ম সম্পাদন করছেন। এগুলাে এতই নিখুঁত যে, আমরা প্রতিবার তাদেরকে সঠিকভাবে পরিচালিত হতে দেখতে পাই । তাই একই সাথে তার কিছু কর্মকে, গাণিতিক সমীকরণগুলিতেও রূপান্তর করা যায়। এবং আমাদের দ্বারা প্রতীয়মান একটি পুনরাবৃত্তিমূলক নিখুঁত ব্যাখ্যাহীন ঘটনাটি
আমাদের দ্বারা 'আইন হিসাবে বলা হয়, কারণ কীভাবে এটা ঘটতে পারে তার পিছনের কারনটি আমরা জানতে পারি না। ঠিক যেন একটি বধির-অন্ধ শিশুকে নিয়মিতভাবে মা শৈশব থেকে খাইয়ে আসছেন যখনই সে কান্না করে। এবং তারপর শিশুটি দাবি করে যে এটি একটি 'আইন' যে, সে কাঁদলেই খাদ্য পায়!
.
যতক্ষন একটি কারণ থাকবে না, এর কোন প্রভাব হবে না। এবং ঈশ্বর চূড়ান্ত কারণ দেখি শ্বেতশার উপনিষদ ৬।৮ কি বলেঃ বাহ্যিক সমর্থন ছাড়া ঈশ্বর তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কেউই তার সাথে তুলনীয় নয় বা তার তুলনায় ভাল নয়। তিনি প্রধান, তার অসীম শক্তি ও অসীম সক্রিয়তার সাথে। ঈশ্বর যদি সক্রিয় না হতেন তবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি, পরিচালনা ও ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে যেত। তিনি প্রাণবন্ত, সর্বত্র ব্যাপ্ত এবং সর্বাধিক সক্রিয়। তিনি যখন কাজ করেন, তখন তিনি কোনও নির্দিষ্ট কাজের জন্য সময় এবং স্থানের উপর নির্ভর করে একটি নিখুত পদ্ধতিতে কাজ করেন, যেটা অতিরিক্তও নয় আবার কমও নয়। সর্বোপরি, তিনি সবচেয়ে নিখুঁত!
.
প্রশ্ন-ঈশ্বর কি অবতার? 
→ঈশ্বর অবতীর্ণ হন না কারণ বেদ স্পষ্টতই তাকে জন্মহীন, নিরাকার এবং অপরিবর্তনীয় হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। অপরদিকে, বেদ বলে যে তিনি সকল সময়ে তাঁর অপরিবর্তনীয় পরিচয় বজায় রেখে সব কর্তব্য পালন করতে পারেন। যর্জুবেদ ৩৪।৫৩ তিনি জন্মহীন এবং সর্বদা এক ও একক সত্তা বজায় রাখেন। যজুর্বেদ ৪০।৮ তিনি সর্বদা সমান, শরীরহীন, স্নায়ুবিহীন, ফাঁকহীন (নিখুত) এবং অপরিবর্তনীয়।
.
প্রশ্ন- শ্রী কৃষ্ণের ন্যায় অবতারগন তাহলে কি তিনি স্পষ্টতই গীতার ৪।৭ এ দাবি করেন যে যখনই ধর্মের (গুনসমূহ) পতন এবং অধর্মের (মন্দের) উত্থান ঘটে, আমি এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই।। 
→বেদে এই ধরনের কোন মন্ত্র নেই যেটা বলে যে ঈশ্বর জন্মগ্রহন করে। যেহেতু বেদই সর্বোচ্চ প্রমাণ; গীতা অবশ্যই বৈদিক লাইনেই ব্যাখ্যা করতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন একজন মহান যােগী। ধর্মের সুরক্ষা এবং অধর্মের ধ্বংসের আকাঙক্ষা এটা মহান লােকেদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। নিঃস্বার্থতা মহান মানুষের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাই, ধর্মের সেবা করার জন্য শ্রী কৃষ্ণ বার বার জন্ম নিতে চেয়েছিলেন। আমরা শ্রী কৃষ্ণের এই মহান চিন্তার প্রতি নম্র, এবং সেই কারণেই তিনি আমাদের নায়ক।
.
প্রশ্ন- কিন্তু ঈশ্বরকে রাবণ এবং কংসের মত মন্দ মানুষকে ধ্বংস করতে দেহগ্রহণ করতে হবে?
→মন্দ লােকদের ধ্বংস করতে অবতার হওয়াটা ঈশ্বরের জন্য খুব ছােট একটি বিষয় যার জন্য তাঁর বৈদিক রীতিনীতিকে ভাঙতে হয় এবং জন্ম গ্রহণ করতে হয়। তিনি যেহেতু সৃষ্টি করতে পারেন, পালন করতে পারেন, সমগ্র মহাবিশ্বকে ধ্বংস করতে পারেন এবং প্রতিটি আত্মার কর্ম-চক্র পরিচালনা করতে পারেন, কেন তিনি এই ধরনের ছােট কাজের জন্য জন্ম গ্রহণ করবেন? সর্বোপরি, তিনি রাবণ ও কংসের দেহেও আছেন এবং তাদের প্রত্যেকটি কর্ম পরিচালনা করেন। তিনি সহজেই তাদের ধ্বংস করতে পারেন যখনই তাঁর মনে হবে এটাই সঠিক সুযােগ।
.
প্রশ্ন- সঠিক উদাহরণ স্থাপন করতে তাঁর জন্ম নেয়া প্রয়ােজন? 
→সঠিক উদাহরণ স্থাপন করার জন্য ঈশ্বরকে অবশ্যই জন্ম দিতে হবে", এটিও ভুল কারণ তিনি ইতিমধ্যেই আমাদের সকলকে যথাযথভাবে বজায় রাখার মাধ্যমে বড় উদাহরণ স্থাপন করছেন। সমগ্র মহাবিশ্বের ব্যবস্থাপনার চেয়ে বড় উদাহরণ কি হতে পারে! ভক্তরা নিজেই এর মাধ্যমে তাঁর মহিমা বুঝতে পারবে। তিনি আমাদেরকে 'ভিতরের কণ্ঠস্বর' দ্বারা সকল দিক দিয়ে পরিচালিত করেন এবং ঈশ্বর কর্তৃক অনুপ্রাণিত আদর্শ ব্যাক্তিগন দ্বারা পরিচালিত করেন) যার কর্মকান্ডসমূহ আমাদের আরও অনুপ্রেরণা দান করে। উপরন্তু, ঈশ্বর ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ব্যথা, আনন্দ, অজ্ঞতা, মরণশীল কর্ম কর্মের ফলাফল, জীবন এবং মৃত্যুর সীমাবদ্ধতার বাইরে। যদি আপনি অবতারদের গল্পগুলি পড়েন, তবে আপনি অবতারগনের কাহিনীগুলাে পড়েন আপনি খুঁজে পাবেন এই বর্ণিত অবতারগন এই প্রবণতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন যেটা কেবলমাত্র আত্মাকে প্রভাবিত করতে পারে ঈশ্বরকে না। আরাে বলা যায় যে ঈশ্বর এই মরণশীল বৈশিষ্ট্যের অধীন হয়ে পড়েছেন এটা সকল দিক দিয়ে নিখুঁত ঈশ্বরের অপমান।
.
প্রশ্ন- আমি যদি বলি ঈশ্বর এই বৈশিষ্ট্যগুলি দ্বারা প্রভাবিত হন না, তবে মানবতা প্রদর্শন করার জন্য কেবল এইগুলির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ভান করেন? 
→এটি আবার ঈশ্বরের একটি অপমান, কারণ ঈশ্বর স্বয়ং সত্য। তিনি একটি নাট্য শিল্পী নন। তিনি কখনাে অভিনয় করেন না। তিনি শুধুমাত্র যা সত্য তাই কেবল করেন। তিনি মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে আমাদের নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও, যদি আমরা বিবেচনা করি যে রাম বা কৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর ছিলেন, তবে তারা তাদের জীবনযাত্রায় যা অর্জন করেছেন তাতে মহান কিছু নেই । ঈশ্বর, যিনি সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি, পরিচালনা এবং ধ্বংস করতে পারেন, অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাম একটি ছােট গ্রহের কিছু অন্যায়কারী ক্ষুদ্র মানুষকে হত্যা করেছেন, আবার প্রচুর যন্ত্রণা ও ব্যর্থতাও সয়েছেন প্রকৃতপক্ষে তার ক্ষমতার ব্যাপারে এটি একটি উপহাসমাত্র হয়।
.
প্রশ্ন- তাহলে রাম এবং কৃষ্ণ কে? 
→রাম এবং কৃষ্ণ ছিলেন ঈশ্বর-অনুপ্রাণিত মহানায়ক। তারা যা অর্জন করেছেন তা ছিলাে আশ্চর্যজনক এবং আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তারা আমাদের নিজেদের জীবন ও চরিত্রকে ঈশ্বরের সত্য উপাসকদের অনুসরিত পথে গঠন করার পরিমাপক (হিসেবে কাজ করে)।
.
প্রশ্ন -কিন্তু অবতার ধারণায় বিশ্বাসী হলে ভুলটা কি? 
→অবতারদের গল্পের কোন স্থান বেদে নেই । অবতারবাদের ধারণা একটি সাম্প্রতিকতম একটি ধারনা । এবং যখন থেকে এই ধারণাটি উত্থাপিত হয়েছে, আমরা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়েছি। সমগ্র পৃথিবীর শাসক থেকে আমরা নিজেরাই নিজেদের কে এমন একটি স্তরে নিয়ে এসেছি যেখানে আমাদের নিজেদের দেশেই নিজেদের যথাযথ অধিকার নেই। এটা দুঃখের বিষয় যে আমরা ঈশ্বরের কাল্পনিক অবতারদের উপাসনায় কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে থাকি, এটা একটা ভুল উপায়। কিন্তু আমরা যাঁদের অবতার হিসেবে পুজা করি, সেই মহান পুরুষের সঠিক উদাহরণ অনুসরণ করে ঈশ্বরের সত্য উপাসনা করার জন্য সম্পদ ও শক্তিকে একত্রিত করি না। এ কারণেই আমাদের শ্রেষ্ঠ অভিপ্রায় সত্ত্বেও, পরমেশ্বরের জন্য প্রকৃন্ত ভালবাসা সত্ত্বেও, আমাদের আছে জন্মভিত্তিক বর্ণবাদের মত অর্থহীন বিষয় এবং লিঙ্গ বৈষম্য, ধর্মান্ধ মতবাদীদের আক্রমন, খ্রিস্টীয়করণ, দুর্নীতি, অনৈতিকতা ইত্যাদি আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এবং এগুলাে লড়াই করে দুর করার পরিবর্তে, আমরা ঈশ্বরের উপহার আমাদের শক্তি, সক্ষমতাকে নষ্ট করি অনুৎপাদনশীল ক্রিয়াকলাপে।
.
প্রশ্ন- তাহলে রাম, কৃষ্ণ, হনুমানজীকে সত্যিকারের সম্মান কিভাবে করা হবে? 
→রাম, কৃষ্ণ, হনুমান প্রভৃতির প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধাটা, তাদের বড় বা ছােট ঈশ্বররূপে বিবেচনা করে এবং তাদের উপর জল, ফুল, দুধ ঢেলে এবং গানের দ্বারা তাদেরকে ঈশ্বররূপে জয়ধ্বনী দিয়ে স্তব করে, হবে না। বরং তারা যা করেছিলেন তা অনুসরন করার মাধ্যমে শ্রদ্ধা প্রদর্শন হবে। তাঁদের অনুসরনে আমাদের দেহকে শক্তিশালী করে, ব্যায়ামের মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করে, ধ্যান, নিয়মানুবর্তি রুটিন, উচ্চতর চরিত্র, জ্ঞান বৃদ্ধি করে, সত্য ধর্ম বা বেদ বুঝে, চারপাশের রাবন ও কংসের সাথে যুদ্ধ করে, সকল দিকে মাতৃশক্তির সন্মান রক্ষা করে এবং সত্যিকারের রামরাজ্য স্থাপন করে (রাম, কৃষ্ণ, হনুমানজীকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে)। এটাই ঈশ্বরের সত্যিকারের উপাসনা, এবং এর কোন সংক্ষিপ্ত পথ নেই। সেই সংগঠন এবং গােষ্ঠী যারা উচ্চস্বরে অবতারবাদ কে রক্ষার জন্য কাজ করেন তাদের প্রতি আমাদের বিনম্র অনুরােধঃ মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের সাথে বিতর্ক করে তাদের কনভেনশন এজেন্ডা মােকাবেলা করতে সঠিক উদাহরণ স্থাপন করুন। ধর্ম রক্ষার জন্য দানের মাধ্যমে প্রাপ্ত কোটি কোটি ডলার মন্দিরসমূহে ব্যায় করুন।  তথাকথিত দলিত ও অস্পৃশ্যদের তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করুন। ধর্ম রক্ষার জন্য তাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত কোটি কোটি ডলার মন্দির সমূহে ব্যয় করুন। তথাকথিত দলিত অস্পৃশ্যদের উন্নয়নের জন্যে কাজ করুন।
.
আদি শঙ্করাচার্য তাঁর পরা-পুজায় লিখেছেনঃ "সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে কীভাবে আমরা আহ্বান বা বিসর্জন দিতে পারি? আসন কিসের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে যিনি আমাদের সবাইকে ইতিমধ্যেই ধারন করে আছেন? ঈশ্বরের পা ও মুখ ধােয়ার জন্য জলের কাজ কি, যেখানে তিনি সবচেয়ে পবিত্র? কিভাবে আমরা তাকে স্নান করাতে পারি? সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর মধ্যে আছে। কিভাবে আমরা তাঁর উপর কাপড় পড়াতে পারি? কিভাবে আমরা তাঁর উপর জানু বা যজ্ঞােপবীত (পবিত্র সুতা) রাখতে পারি? যেখানে তিনি সকল বর্ণ বিভাগকে ছাপিয়ে যান। কিভাবে আমরা সেই একক সত্তার মূর্তির উপাসনা করতে পারি ? যিনি নিরবিচ্ছিন্ন, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার এবং সর্বত্র বিরাজিত?
.
প্রশ্ন -তাই অবতার হওয়ার পরিবর্তে, ঈশ্বর নবীদের পাঠান, ঠিক? 
→ঈশ্বর নবীদের পাঠান এই ধারণাটি সবচেয়ে অর্থহীন ধারণা । উদাহরণস্বরূপ, মুসলিমরা মনে করে আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান একই সাথে নবীকেও বিশ্বাস করেন। এভাবে, তারা বুঝায় যে আল্লাহ্ সরাসরি জীবদেরকে পরিচালনা করতে যথেষ্ট সক্ষম নন এবং তাই তাঁকে সাহায্য করার জন্য নবী এবং দেবদূতদের মত এজেন্ট ব্যবহার করতে হয়। এবং ঈশ্বরের ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলাের দিকে খেয়াল করুন যখন তিনি নবীদের দ্বারা কাজ করেন। যীশু একজন নবী হতে পারেন, এবং তিনি যথাযথভাবে বাইবেল নথিভুক্ত করতে পারেন নি। যাই তিনি করেন না কেন ব্যর্থ হয়েছেন কারণ প্রকৃত বাইবেল এখন আর বিদ্যমান নেই। একইভাবে, মুহাম্মদকে আল্লাহর নবী বলা হয় কিন্তু তার জীবনকালের সময় কোরআন সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করতে পারলেন না। তিনি এমনকি জানতেনও না তাঁর বইকে কুরআন বলা হবে। কুরআন পরবর্তীতে তার মৃত্যুর ২০ বছর পর বিতর্কিত উপায়ে সংকলন করা হয়। বর্তমানে কুরআনের যে প্রাচীন কপিটি সচরাচর পাওয়া যায় সেটি মুহাম্মদের মৃত্যুর ৩০০ বছর পরের এবং এটি তার মৃত্যুর ২০ বছর পর সংকলিত কুরআনের একটি কপি বলে মনে করা হয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভক্ত সম্প্রদায় যারা নবী-রাসুলে বিশ্বাস করে তাদের এই হলাে পথ। কিন্তু বৈদিক ঈশ্বর সত্যিই সর্বশক্তিমান এবং তাই এজেন্টদের ব্যবহার করার পরিবর্তে তিনি সকল আত্মার সাথে সরাসরি যােগাযােগ করেন। তিনি মানব সভ্যতার প্রতিষ্ঠার সময়ে বেদ প্রকাশ করেন এবং তারপর ক্রমাগত সব জীবিত সত্তার দিক নির্দেশনা প্রদান করেন । তিনি কঠোর উপায়ে সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ বেদকে নিরাপদ করার জন্য আমাদের প্রেরণা দিয়েছেন । আর অধিকন্তু তাঁর 'ভেতরের কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেন যে, এমনকি আমরা যদি বেদ ব্যবহার নাও করতে পারি, আমরা তখনও তাঁর দ্বারা পরিপােষিত হব এবং পরিচালিত হব ঠিক যেভাবে একজন মা সন্তানকে দেখভাল করেন। বৈদিক ঈশ্বর আমাদের অভ্যন্তরে এবং বাইরে । তাই আমাদের নির্দেশনা পেতে তৃতীয় পক্ষের আউটসাের্সিং এজেন্টের কোন দরকার নেই। আমাদের তাই কেবলমাত্র এই সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান, যত্নশীল এবং শুধুমাত্র ঈশ্বরেরই উপাসনা করা উচিত । সমস্ত নবী মিথ্যা এবং (এই মতবাদ) ঈশ্বরের মহিমার গুরুতর অবমাননা। অতএব, যাদের মনে ঈশ্বর। আল্লাহর জন্য কোন সম্মানবােধ আছে তাদের অবিলম্বে (এই মতবাদ) প্রত্যাখ্যাত করা উচিত।
.
প্রশ্ন - কি তাঁর ভক্তদের পাপ ক্ষমা করেন না? 
→ঈশ্বর শুধুমাত্র ভবিষ্যতের পাপ ক্ষমা করেন । ঈশ্বরের একনিষ্ট উপাসক হওয়ার দ্বারা, আমাদের মন শুদ্ধ হয়, এবং সেইজন্য, ভবিষ্যতে আমাদের দ্বারা কৃত পাপ কাজ ক্ষীন থেকে ক্ষীনতর হয়। ঈশ্বর এই শুদ্ধি প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করেন। কিন্তু অতীতের পাপ কখনাে ক্ষমা করা হয় না। আমাদের প্রতিটি কাজ সেটা ভাল বা খারাপ যাই হােক না কেন, অবশ্যই যথাযথ ফলাফল প্রদান করে। কোন রেকর্ডই মুছে ফেলা হয় না।
যাইহােক, ফলাফলগুলি হল এমন যে কেবলমাত্র আমাদের সর্বোত্তম সুফলের জন্য তাদের অভিপ্রায় অর্থাৎ আমাদেরকে পরম আনন্দের দিকে অগ্রসর করানাে। এটা হয় তাঁর (ঈশ্বরের) নিঃশর্ত দয়াশীলতার কারণে।
.
এইভাবে, মানুষ, যারা বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করে, উপবাস, রোজা করে, তীর্থযাত্রা করে, স্নান করে তাদের অতীতের রেকর্ড মুছে ফেলার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে এবং নিজেদের বােকা বানায় । এইভাবে আপনি দেখবেন যে প্রতারক রাজনীতিবিদ, অভিনেতা এরা ঈশ্বরের নিকট এককাঠি বেশি 'ঘনিষ্ঠ । এইভাবে অশ্লীল সিনেমাগুলি দেবতাদের। পূজার স্থানের বা ধর্মীয় শ্লোকের মাধ্যমে শুরু হয়। এ ধরনের মানুষ ব্যাপক ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এবং তাদেরকে গির্জা, দরগা, মসজিদ গুলােতে প্রায়ই দেখা যায়। এটি শুধুমাত্র প্রচারের কৌশল হিসাবে কাজ করে না, অধিকন্তু এটি তারা সামঞ্জস্য আনয়নের জন্য করে থাকে যাতে তারা নিয়মিত যেসব ঘৃন্য পাপ করেছে তা যেন মুছে যায়। ঠিক যেমন  কেবলমাত্র একটি পিল খেলে দূর হয় না বা 'দুঃখিত শব্দটা বললেই পাপের প্রবণতা তাৎক্ষণিক ভাবে মুছে যায় না। এটা নিয়মিত প্রচেষ্টার দাবি রাখে এবং সেই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে, প্রতিটা সংঘটিত পাপ হিসাব করা হবে কোন রকম মুছে ফেলা বা 'হিসাবের সমতা আনয়ন ছাড়া। বাস্তবে, ঈশ্বর ন্যায় বিচার করার জন্য অপেক্ষা করেন না।
.
যে মুহূর্তে আমরা কোন ভালাে বা খারাপ কর্ম করি, তিনি আমাদেরকে ফলাফল দিতে শুরু করেন। যাইহােক, এই ফলাফলের বাস্তব প্রভাব অবিলম্বে বা কিছুসময় পর আমাদের কর্ম এবং আমাদের বুঝতে পারার ক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের দ্বারা পরিলক্ষিত হয় । যখন ফলাফল অনুধাবন করতে বিলম্ব হয়, তখন আমরা এটিকে অতীতের কর্মফল হিসাবে অভিহিত করি। কিন্তু বাস্তবে, এই প্রক্রিয়াটি অবিরতভাবে ঘটে চলছিলাে ঠিক যে মুহুর্ত থেকে আমরা কাজটি করেছিলাম তখন থেকেই। এটা অনেকটা ডায়াবেটিসের মত যেটা অবিরত ঘটতে থাকে, আমাদের গ্রহন করা প্রতিটি খাদ্যের মাধ্যমে বা আমরা ব্যায়াম করেছি বা করিনি (তার মাধ্যমে) বা আমরা কোন চাপ নিয়েছি বা নেইনি (তার মাধ্যমে) । তবে তার প্রভাব হয়তােবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরেই প্রকাশ হতে পারে। এছাড়াও, ঈশ্বর যদি পাপের অতীতের রেকর্ডগুলিকে মুছে ফেলতেন, তবে তিনি আর ন্যায় বিচারক থাকতে পারবেন না কারণ সবারই প্রবণতা থাকবে এই মুহুর্তে অপরাধ করার এবং তারপর পরবর্তীতে 'দুঃখিত' বলবে পূর্বে উল্লেখিত প্রতারক লােকেদের মতন। এবং যদি ঈশ্বর তাদের কথা শুনেন, তবে তাদের এই নির্বুদ্ধিতা কেবল আরও আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরনা পাবে । এমনকী যারা পাপ করে না তারাও পাপ কাজের প্রেরণা পাবে। অতএব, ঈশ্বর ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু উভয়ই, যেটা নিশ্চিত করে যে আমাদের প্রত্যেকটি কর্ম কমও নয় বা বেশিও নয় একদম যথাযথ ফল প্রদান করে কারণে শুধুমাত্র আমাদের উপকারের জন্য। অতএব, সে সকল দলীয় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা যারা তাদের নবীকে স্বীকার করার মাধ্যমে পাপের ক্ষমা লাভের লােভ দেখিয়ে লােকেদেরকে আকৃষ্ট করে, তারা ঈশ্বরকে অপমান করে এবং নিজেদেরকেও বােকা বানায়। সমস্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের অবিলম্বে তাদের প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
.
প্রশ্ন -আমরা শুনেছি যে ঈশ্বর জানেন, অতীতে যা ঘটেছে, যা এখন ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে। সুতরাং, যাহাই তিনি জানেন, আত্মাকে সে অনুসারে কাজ করতে হয় । অতএব, আত্মা কর্মে স্বাধীন নয় এবং নিছক একটি পুতুল মাত্র । তবুও, আত্মাকে ঈশ্বর অন্যায়ভাবে শাস্তি প্রদান করে?
→এই অভিযােগগুলি ঐসব দলবর্গের পক্ষে সত্য, যারা বিশ্বাস করে যে, ঈশ্বর পূর্বেই প্রত্যেকের নিয়তি লিপিবদ্ধ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, জাল কুরআন ও হাদীসগুলির উপর ভিত্তি করে অনেক মুসলমান বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ইতােমধ্যেই লােহে মেহফুজে প্রতিটি ভবিষ্যতের ঘটনা সংকলন করেছেন এবং এটি তার সিংহাসনের নিচে রেখেছেন। তারা এভাবে আল্লাহকে একজন মনােবৈজ্ঞানিক স্বৈরশাসক বানিয়েছে যিনি আত্মার সৃষ্টি করেছেন এবং তারপর তাঁর খেয়াল অনুযায়ী কাজ করার জন্য তাদেরকে বাধ্য করেছেন । তিনি কিছু আত্মাকে শাস্তি দেন, অন্যদেরকে পাপ করতে লােভ দেখান এবং বেপরােয়াভাবে অন্য আত্মাদের পক্ষাবলম্বন করেন। যদি এমন একটি বই প্রকৃতপক্ষে বিদ্যমান থাকে তবে তা কেবল সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অপমান হতাে। এ ছাড়াও, যেহেতু আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত, তবে কেন একটি বই (লােহে মেহফুজ) তৈরি করার দরকার হলাে যেটা তিনি কেবল পড়তে পারেন? তিনি কি ভয় পাচ্ছেন যে তাঁর স্মরনশক্তি হারিয়ে যেতে পারে?এছাড়াও (আরাে প্রশ্ন) এই বইয়েও (অর্থাৎ লওহে মাহফুজেও) কি লেখা আছে যে আল্লাহ্ লওহে মাহফুজ বইটি লিখবেন? এই ধরনের তত্ত্ব হলাে শিশুসুলভ এবং স্পষ্ট গােজামিলে পূর্ণ। কিন্তু এই ধরনের কল্পনাগুলি বৈদিক ঈশ্বরের জন্য প্রাসঙ্গিক নয় । অতীত বােঝায় কিছু ছিলাে কিন্তু এখন আর বিদ্যমান নেই । ভবিষ্যত বােঝায় এখন বিদ্যমান নয়। কিন্তু ঈশ্বরের জ্ঞান সবসময় একই এবং অভিন্ন ও সত্য। অন্য কথায়, যে জিনিসগুলির অস্তিত্ব নেই তা ঈশ্বরীয় জ্ঞানের এক্তিয়ারে বা সীমানায় পড়ে না। ভবিষ্যত এবং অতীত কেবলমাত্র (জীবের) আত্মার জন্য, ইশ্বরের জন্য নয়, যিনি এই ধরনের সময়ের সীমাবদ্ধতার বাইরে। কেউ বলতে পারেন যে জীবাত্মার কর্মের ব্যাপারে ঈশ্বর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত জানেন, কিন্তু সহজাতভাবে তিনি সময়ের সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে । অন্য কথায়, ঈশ্বর জানেন, একটি আত্মা (জীবাত্মা) কি করে এবং কী ফল তাকে সঠিকভাবে দিতে হবে। কিন্তু ইশ্বরকে ইতিহাসের কথা জানতে অতীতের দিকে তাকাতে হয়। কিংবা কী ঘটবে তা আবিষ্কার করতে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হয় না। তিনি সর্বদা বর্তমান এবং সকল সময়ে সত্য স্বাধীন জ্ঞানের অধিকারী (জীবের) কর্মসমূহে ও ফল প্রদান উভয় ক্ষেত্রে।
.
বর্তমানে কর্ম করার ব্যাপারে আত্মা কিছুটা স্বাধীন (এর অতীত কর্মের ফলস্বরূপ এই জন্মে প্রাপ্ত সংস্কার বা প্রবৃত্তি সাপেক্ষে) কিন্তু এই সমস্ত কর্মের ফলাফলের জন্য সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল । এখন ঈশ্বর নিশ্চিত করছেন যে এই (কর্মের) ফলাফলগুলি এমনই যে আত্মার এই সংস্কারগুলাে (যেগুলাে কর্মফলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়। বিশেষায়িত করা হয়েছে আত্মাকে সহায়তা করতে যাতে সেই আত্মা তার সীমিত স্বাধীনতাকে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারে স্বাধীন ইচ্ছার সীমাকে আরাে বৃদ্ধি করতে পারে এবং পরমসুখ অর্জন করতে পারে সবচেয়ে সন্তোষজনক উপায়ে। এইটি প্রতিটি মুহুর্তে একটি চলমান প্রক্রিয়ায় ঘটতে থাকে। যােগের সমগ্র ক্ষেত্রটি আমাদের সর্বোত্তম কল্যানের জন্য ঈশ্বরের এই বিধানকে যুক্ত করার উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে।
.
প্রশ্ন- আত্মাও কি ঈশ্বর এবং মােক্ষলাভের পরে ঈশ্বর হয়ে যায়? যদি তা না হয় তাহলে অদ্বৈত কি? 
→আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আরাে বিস্তারিতভাবে আত্মার প্রকৃতি অধ্যয়ন করব। কিন্তু সংক্ষেপে উত্তর দিতে গেলে, আত্মা ঈশ্বর নয় । আত্মা যদি ঈশ্বর হয়, তাহলে এটি ইতিমধ্যেই ঈশ্বর। কেন তবে আমরা এখন সমগ্র মহাবিশ্ব পরিচালনা করতে অক্ষম এবং এক আত্মা (ঈশ্বর) অন্য এক আত্মার (ঈশ্বর) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যখন তারা এক এবং একই ? যদি আপনি মায়া বা অজ্ঞতার কারণ বলে থাকেন তবে এর মানে হল যে ঈশ্বরও অজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত । এখন এইটি বেদ বিরুদ্ধ, বেদে পরিষ্কারভাবে বলছে যে ঈশ্বর অজ্ঞতা সীমাবদ্ধতার অতীত এবং সবসময় তাই থাকেন।
.
এছাড়াও, যদি আমি ঈশ্বর হই এবং বুঝতে না পারি যে আমি ঈশ্বর, তাহলে এই মুহুর্তে মহাবিশ্বের পরিচালনা করছেন কে? যদি আপনি বলে থাকেন যে আমি মহাসমুদ্রে এক ফোঁটা জল যেমন, তেমনি বিশাল 'প্রধান ব্রহ্ম যিনি জগত পরিচালনা করছেন তাঁর এক ক্ষুদ্র অংশ, তাহলেও (প্রশ্ন থাকে) নিশ্চয়তা কী হবে যে, 'প্রধান ঈশ্বরও' অজ্ঞতা ও পাপের দ্বারা প্রভাবিত হন না এবং এভাবে মহাবিশ্বকে পরিচালনা করছেন ভুলভাবে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত পদ্ধতিতে ? সর্বোপরি, (হাস্যকর) এটাই যে ঈশ্বর আমাতেও আছেন, আমিও ঈশ্বর এবং আমি জানি আমি এখন অজ্ঞ!
.
এই সকল কিছু কল্পিত যুক্তিতে পরিনত হবে যেটা হয়তাে কবিতা এবং উদ্ধৃতিতে ভাল লাগতে পারে, কিন্তু যুক্তিপূর্ণভাবে নিরাপদ, এভাবে অভিহিত যাবে না। আত্মা ঈশ্বর হন বেদে কোথাও এ ধরনের ধারনা নেই বরং এর পরিবর্তে স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে আত্মা ও ঈশ্বর আলাদা আলাদা। অদ্বৈত মতবাদটি এক এবং একমাত্র ঈশ্বরের বৈদিক ধারণাকে বােঝায়। এর মানে হল যে শুধুমাত্র এক ঈশ্বর আছে এবং আর নেই। তিনিই শুধুমাত্র উপাস্য।
.
প্রশ্ন -যদি এমন হয় তাহলে শঙ্করাচার্য আত্মা এবং ঈশ্বর একইরকম কথা কেন বলেছেন? 
→শঙ্করাচার্য একজন বৈদিক পণ্ডিত ছিলেন যিনি এমন একটি যুগে বসবাস করতেন যেখানে নিরীশ্বরবাদ প্রচলিত ছিল। তিনি যুক্তিতর্কের দ্বারা নিরীশ্বরবাদের বিরােধীতা করতেন, নাস্তিকতার দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে এমন যেকোন কিছুর (বিরােধীতা করতেন), এমনকি আত্মাকে স্বয়ং ঈশ্বররূপে বিবেচনা করে অধিকতর বিশ্বাসযােগ্যভাবে প্রমান করতে পারতেন। যদি তিনি এমনটা না করতেন, আমরা বৈদিক জ্ঞানকে রক্ষা করতে সক্ষম হতাম না। এই মহান কাজের জন্য তাঁর প্রতি আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
.
যখন শঙ্করাচার্য জন্মগ্রহণ করেন, বেদ থেকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আহরণ করার ঐতিহ্য ইতিমধ্যে প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল। বেদ শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার পালনের পুস্তকরূপে বিবেচনা করা হচ্ছিলাে। এভাবে, এমনকি শঙ্করাচার্যও বেদ নির্ভর থাকেননি এবং বেদান্ত, গীতা ও উপনিষদগুলির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন, যা সেই সময়কালে সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল । এইভাবে তিনি এই মহান বইগুলির উপর তার যুক্তিতর্কগুলাের ভিত্তি করতেন এবং নিরীশ্বরবাদের বিরােধীতা করতেন। তিনি ন্যায়দর্শনের নিয়মানুসারে এটি করতেন, যেটি স্বল্পমেয়াদে একটি অধিকতর বিপজ্জনক রীতিকে মােকাবেলার জন্য 'বিতন্ডা' বা অপেক্ষাকৃত উত্তম যুক্তি প্রদানকে স্বীকার করে। যাহােক লক্ষ্য করুন এই 'বিতন্ডার' ক্ষেত্রটি কেবল যুক্তি বিচারেই সীমাবদ্ধ এবং তাদের মধ্যে বাস্তবতা নেই।
.
এখানে বিতন্ডার একটি উদাহরণঃ 
প্রাথমিক রীতিঃ সকল ধর্মত্যাগকারী যারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে এবং এর বিরুদ্ধে প্রচার করে তাদেরকে হত্যা করা উচিত - জাকির নায়েক।
.
বিতন্ডা যুক্তিঃ একজন ধর্মত্যাগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে, বাকি জনসংখ্যা তার মতবাদকে (অর্থাৎ ইসলাম বিরােধী মতবাদকে) প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসলাম প্রচার করছে । অতএব, তাকে নয় বরং ইসলাম প্রচারকারীদেরকেই হত্যা করা উচিত।
.
প্রাথমিক রীতিঃ কিন্তু এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। অতএব, রাষ্ট্রের বাকী লােকদের নয়, ধর্মত্যাগী ব্যাক্তিটিই রাষ্ট্র বিরােধীতাকে হত্যা করা উচিত। - জাকির নায়েক।
.
বিতন্ডা যুক্তিঃ এই যুক্তি দ্বারা, মুহাম্মদকে হত্যা করা আবশ্যক, যখন তিনি প্রথম ইসলাম প্রচার করেছিলেন । কারণ একমাত্র তিনি ছিলেন ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞাত ও সমগ্র রাষ্ট্র ইসলামে বিশ্বাস করেনি।
.
উল্লেখ্য যে আমরা বলতে চাই না যে সমস্ত মানুষকে হত্যা করা উচিত বা মুহাম্মদকে হত্যা করা উচিত ছিল । কিন্তু আমরা এই বিতর্কগুলাে ব্যবহার করেছি শুধুমাত্র একটি অদ্ভুত যুক্তিকে মােকাবেলা করার জন্য যা বহুসংখ্যক জ্ঞানহীন লােকেদের মধ্যে প্রচলিত। অদ্বৈত যুক্তিতর্কের বেলায়ও এমনটাই ঘটেছে। শঙ্করাচার্য ঈশ্বরের অস্তিত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং নিরীশ্বর বাদের বিরােধীতার জন্য এইগুলি ব্যবহার করেছিলেন। এবং তিনি বেদ বিরােধী সকল নিরীশ্বরবাদী মতাদর্শকে পরাজিত করার পর কিন্তু তাঁর প্রখর মেধা থেকে আরও বেশি কিছু দান করার আগেই অত্যন্ত অল্প বয়সে ৩২ বছর বয়সে মারা যান । তাই আমরা তাঁকে ভুলভাবে আত্মা = ঈশ্বর এই মতবাদে বিশ্বাসী বলে বিবেচনা করি।
.
প্রকৃতপক্ষে, বেদান্ত, উপনিষদ এবং গীতা থেকে তাঁর মন্তব্য গুলিতে বিপুল সংখ্যক এমন শ্লোক আছে যেটা ইঙ্গিত দেয় তিনি ইশ্বর এবং আত্মা আলাদা এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক সত্ত্বেও, এত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যে অদ্ভুত কাজ করতে পেরেছিলেন তা কল্পনা করুন! গুরুকুল শিক্ষার মূল বিষয়গুলাে অর্জন করতেই কমপক্ষে ২৫ বছর সময় লাগে। এবং ৩২ বছর বয়সে, আমাদের একজন মহান পণ্ডিত ব্যক্তি যিনি আমাদের দেশ ও পৃথিবীর ভবিষ্যত বদলে দিয়েছেন! আসুন আমরা সকলে তাঁর মহান প্রতিভাকে নম্রভাবে সন্মান জানাই এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে ঈশ্বর যেন আমাদের সকলকে একই রকম মেধা দান করেন।
.
প্রশ্ন -ঈশ্বর কি রাগি (আবেগ এবং অনুভুতি পূর্ণ) বা বিরক্ত (ক্রোধ প্রকাশকারী) ? 
→ঈশ্বর এসবের মধ্যে নেই । ঈশ্বর এই ধরনের প্রবণতার বাইরে কারণ আবেগ এমন জিনিসগুলির জন্য হয় যেগুলাে আগে থেকেই আমাদের অংশ নয় এবং 'অধিকার বর্জন সে সকল জিনিসগুলাের ক্ষেত্রে হয় যেগুলাে আমরা যা পূর্বে অর্জন করেছি। কিন্তু যা কিছু দরকার ঈশ্বর এমনিতেই তার অধিকারী এবং কোন কিছুকে ত্যাগ করতে হয় না কারন তিনি। সদা সর্বত্র বিরাজমান।
.
প্রশ্ন -ঈশ্বরের কি কোন কিছুর আকাঙ্খা আছে? 
→ঈশ্বরের কোন ধরনের আকাঙ্খা নেই যেমনটা আত্মার মধ্যে আমরা দেখতে পাই। আত্মা সে। সকল কিছুর জন্য আকাঙ্খা করে যা সে অর্জন করতে পারেনি। তাই সকল কিছুর অধিকারী কিভাবে কোন কিছুর আকাঙ্খা  করতে পারে ? এবং পরমানন্দময় হয়ে, তাঁর এমনকি সুখ কামনা করারও প্রয়ােজন নেই। যাইহােক, তিনি আত্মাকে সুখ প্রদানের উদ্দেশ্যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ধ্বংসের প্রেরণা যােগান। এটিকে ঈশ্বরের 'ইক্ষন' বা তার কর্মের উদ্দেশ্যপূর্ণতা হিসেবে অভিহিত করা হয়।
.
যারা মনে করেন যে ঈশ্বর আত্মার দ্বারা উপাসনা কামনা করে থাকেন তারা প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরকে আত্মতােষক, প্রশংসা লােভী স্বৈরশাসক বলে মনে করে অপমান করছে। আমরা যাহাই উপাসনা করি, তা করি নিজেদের উন্নত করতে এবং তাহা ঈশ্বরকে কোন ভাবেই প্রভাবিত করে না।



No comments:

Post a Comment