স্বরস্বতী পূজা কেন করা হয়?- স্বরস্বতীর উত্থান কি ব্রহ্মের মুখ থেকে হয়েছিল? - VedasBD.com

Breaking

Friday, 24 January 2020

স্বরস্বতী পূজা কেন করা হয়?- স্বরস্বতীর উত্থান কি ব্রহ্মের মুখ থেকে হয়েছিল?



সরস্বতী পূজা আমাদের সনাতন/হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি অন্যতম প্রচলিত পূজা। সরস্বতী দেবীকে শিক্ষা, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী ও আশীর্বাদাত্রী মনে করা হয়। বাংলা মাঘ মাসের শুক্লা পক্ষের পঞ্চমী তিথীতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষা, সংগীত ও শিল্পকলায় সফলতার আশায় শিক্ষার্থীরা দেবীর পূজা করে থাকে।

বাকদেবী, বিরাজ, সারদা, ব্রাহ্মী, শতরূপা, মহাশ্বেতা, পৃথুধর, বকেশ্বরীসহ আরও অনেক নামেই দেবী ভক্তের হৃদয়ে বিরাজ করে।

পুরাণ অনুযায়ী দেবী সরস্বতীর ব্রহ্মের মুখ থেকে উত্থান। দেবীর সকল সৌন্দর্য ও দীপ্তির উৎস মূলত ব্রহ্মা। পঞ্চমস্তকধারী দেবী ব্রহ্মার এক স্বকীয় নিদর্শন

পূজার জন্য দেবী সরস্বতীর মূর্তি শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে থাকে যা পবিত্রতার নিদর্শন। দেবীর আসনকে পুষ্পশোভামণ্ডিত করে রাখা হয়। পরিবারের সকল সদস্য খুব ভোরে স্নান শেষে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করে দেবীর সামনে অবস্থান করে থাকে। পুরোহিত পূজা শুরু করবার আগ পর্যন্ত দেবীর মুখমণ্ডল ঢাকা থাকে। পূজার অর্ঘ্যের পাশাপাশি দেবী পূজার আরেকটি প্রধান অংশ ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তক। সরস্বতী পূজার একটি বিশেষ অর্ঘ্য হল পলাশ ফুল। দেবীর অঞ্জলির জন্য এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।

.
সরস্বতী পূজা হিন্দু বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুকা পঞ্চমী তিথীতে সরস্বতী পূজা আয়োজন করা হয়। তিথীটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। উত্তর ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশ্যা, নেপাল ও বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। শ্রীপঞ্চমীর দিন অতি প্রত্যুষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের গৃহ ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয়। ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে এই দিন শিশুদের হাতেখড়ি, ব্রাহ্মণভো ও পিতৃতর্পণের প্রথাও প্রচলিত। পূজার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপ গুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। পূজার পরের দিনটি শীতলষষ্ঠী নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কোনো কোনো হিন্দু পরিবারে সরস্বতী পূজার পরদিন অরন্ধন পালনের প্রথা রয়েছে।
.
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে যতটুকু জানা যায়- 
সরস্বতী বিদ্যার দেবী। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণের প্রকৃতি খণ্ডের প্রথম অধ্যায় বলা হয়েছে- বুদ্ধিরূপা, বাক্যরূপা, বিদ্যারূপা। সঙ্গীত ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে সরস্বতী পূজিত হয়ে থাকেন, স্মৃতি ও মেধা দান করেন। সব মিলিয়ে সরস্বতী সর্ববিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবেই পূজিত হয়ে থাকেন। পদ্মপুরাণ মতে– ‘দেবী সরস্বতী আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাহার হস্তে শ্বেত রুদ্রারে মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা।’

সরস্বতীর বাদিত বীণার নাম কচ্ছপী। দেবী কখনো দ্বিভুজা, কখনো চতুর্ভুজা, আবার প্রয়োজনবোধে কখনো বা ষোড়শভুজা। এই দেবীর চিত্র বা মূর্তি অনুসারে যত প্রকরণ পাওয়া যায়– তাদের সকলেরই মাথার উপর মন্দিরের মতো উঁচু মুকুট রয়েছে। সকলেই ললিত মুদ্রাসনে আসীনা, একটি পা নীচু করে রাখা, আর একটি পা সম্মুখদিকে গুটানো। সকলেরই ডান হাত বুকের উপর বরমুদ্রায় স্থাপিত, বাম হাত মোড়া এবং উঁচুতে তোলা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভূজা সরস্বতী পূজিতা হন। ইনি অমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভুজা বা চতুর্ভুজা, রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা।’
.
মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি। শ্রীশ্রী সরস্বতী মায়ের পূজার দিন। সরস্বতী শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থে ‘সরস্+বতু’ স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত যোগে ‘সরস্বতী’। ‘সতত রসে সমৃদ্ধা’। তিনি শুক্লবর্ণা, শুভ্র হংসবাহনা, ‘বীণা-রঞ্জিত পুস্তক হস্তে’ অর্থাৎ এক হাতে বীণা ও অন্য হাতে পুস্তক।
.
সেগুলোর গূঢ় রহস্য তথা যথার্থ তাৎপর্য হৃদয়ে ধারণ করে মাকে পূজার্চনা করা উচিত। নয়তো পূজার আড়ম্বরতা যতই হোক না কেন তা অর্থহীন। শিক্ষার্থীরা দেবী সরস্বতীর পূজা বেশি করে। কেন? কারণ তিনি জ্ঞানদায়িনী বিদ্যার দেবী সরস্বতী। বিদ্যা দান করেন তিনি। মানুষ জ্ঞান পিপাসু। সর্বদা জ্ঞানের সন্ধান করে। ‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ 
.
তাছাড়া এই দিন শিক্ষার্থীসহ পূজিত সবাই যেন তার তাৎপর্য ও পূজার মূল আচরণে পূজিত হন সে কথা বিচার্য রেখে তার বর্ণনায় লক্ষ্য করা যাক:-
.
দেবী শুক্লবর্ণা: শুক্লবর্ণ মানে সাদা রং। সত্ত্বগুণের প্রতীকও হলো সাদা। পবিত্র গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের ৬নং শ্লোকে আছে ‘তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাৎ’ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ অতি পবিত্র গুণ, স্বচ্ছতার প্রতীক, নির্মলতার প্রতীক। আবার ওই অধ্যায়েরই ১৭নং শ্লোকে আছে, ‘সত্ত্বাৎ সংজায়তে জ্ঞানং’ অর্থাৎ সত্ত্বগুণে জ্ঞান লাভ হয়। তাই জ্ঞানময়ী সর্বশুক্লা দেবী শ্রীশ্রী সরস্বতী জ্ঞানে গুণান্বিত বলে তার গায়ের রং শুক্লবর্ণা অর্থাৎ দোষহীনা ও পবিত্রতার মূর্তি। আর জ্ঞানদান করেন বলে তিনি জ্ঞানদায়িনী। 
নহিজ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে'(গীতা-৪।৩৯) অর্থাৎ ‘জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছু নেই’। আমরাও যেন সে গুণের অধিকারী হতে পারি এ আমাদের প্রার্থনা।
.
হংসঃ জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর বাহন শ্বেতহংস। হাঁস অসারকে ফেলে সার গ্রহণ করে। দুধ ও জল মিশ্রণ করে দিলে হাঁস জল ফেলে শুধু দুধটুকু গ্রহণ করে নেয়। কিংবা কাঁদায় মিশ্রিত স্থান থেকেও তার খাদ্য খুঁজে নিতে পারে। মায়ের সঙ্গে পূজিত হয়ে শিক্ষা দিচ্ছে- সবাই যেন সবার অসার বা ভেজাল/অকল্যাণকর পরিহার করে সার বা ভালো কিছু অর্থাৎ নিত্য পরমাত্মাকে গ্রহণ করেন এবং পারমার্থিক জ্ঞান অর্জন করে সুন্দর পথে চলতে পারি।
.
বীণাঃ ‘জীবন ছন্দময়’। বীণার ঝংকারে উঠে আসে ধ্বনি বা নাদ। বিদ্যাদেবী সরস্বতীর ভক্তরা সাধনার দ্বারা সিদ্ধি লাভ করলে বীণার ধ্বনি শুনতে পান। বীণার সুর মধুর। পূজার্থী বা বিদ্যার্থীর মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয় এবং জীবনও মধুর সংগীতময় হয় এ কারণেই মায়ের হাতে বীণা। হাতে বীণা ধারণ করেছেন বলেই তার অপর নাম বীণাপাণি।
.
পুস্তকঃ বিদ্যার্থীর লক্ষ্য জ্ঞান অন্বেষণ। আর সে জ্ঞান ও বিদ্যা অন্বেষণের জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডার ‘বেদ’ তার হাতে রয়েছে। ‘বেদই বিদ্যা’। তিনি আমাদের আশীর্বাদ করছেন- ‘জীবনকে শুভ্র ও পবিত্র রাখ। সত্যকে আঁকড়ে রাখ। মূল গ্রন্থের বাণী পালন কর। জীবন ছন্দময় কর। স্বচ্ছন্দে থাক।’
.
উল্লেখ্য, প্রতিটি দেব-দেবীর প্রণাম-মন্ত্র ও পুষ্পাঞ্জলি প্রদান মন্ত্র আমাদের সবার জানা উচিত। নিম্নোক্ত মন্ত্রগুলি হল -
.
সরস্বতী দেবীর প্রণাম ও পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রঃ
ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে।।
ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈই নমো নমঃ।
বেদ বেদান্ত বেদাঙ্গ বিদ্যাস্থানভ্যঃ এব চ
এষ সচন্দন পুষ্প বিল্বপত্রাঞ্জলি ওঁ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ।।
.
জ্ঞানদায়িনী সরস্বতী মায়ের পূজাতে ফাঁকি না দিয়ে আমরা সবাই সঠিকভাবে তার পূজা করি। তার পূজার শিক্ষায় আমরা সর্বদা সবাই শুদ্ধ জ্ঞানচর্চায় যেন রত থাকি এবং প্রার্থনা করি-
.
ওঁ অসতো মা সদ্গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যুর্মা অমৃতংগময় আবিরাবির্ম এধি।।
অনুবাদ- হে ঈশ্বর, আমাকে অসৎ থেকে সৎ লোকে, অন্ধকার থেকে আলোতে এবং মৃত্যু থেকে অমৃতে নিয়ে যাও।
.
এছাড়া বৈদিক যুগের শুরুতে সরস্বতীর প্রধান পরিচয় ছিল নদী হিসেবে। আর্যরা ভারতের ব্রহ্মাবর্ত নামক একটি স্থানে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই স্থানের একটি নদীকে আর্যরা সরস্বতী নামে আখ্যায়িত করেন। এই নদীটি ক্রমে ক্রমে পবিত্র নদী হিসেবে আর্যদের কাছে সম্মানিতা হয়ে ওঠে। বেদে সরস্বতী নদীর উল্লেখ আছে।

.
সুবল চন্দ্রমিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধানের মতে, ভারতের প্রথম আর্য উপনিবেশ স্থাপনের সময় পাঞ্জাব প্রদেশে এই নদীর তীর প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এই নদীটি সরমুর নামক স্থানে উদ্গত হয়ে অম্বালা জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অনেক জায়গায় বালুর ভেতরে নদীটি হারিয়ে গেছে, আবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পরে এটি পরিণত হয়ে- থানেশ্বর ও কুরুর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাতিয়ালা রাজ্যে প্রবেশ করেছে। পরে এই নদী ঘর্ঘরা (ঘাগগর) নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে– অন্তর্সলীলারূপে প্রবাহিত নদীটি প্রয়াগধামে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।ধারণা করা হয়, এই নদীগুলোর ভেতর ঘাগগর নদীকে বেদে বর্ণিত সরস্বতীকে বিবেচনা করা হয়। এই নদীর তীরে ঋষিরা অত্যন্ত নির্বিঘ্নে ধর্মাচারণের জন্য আবাসভূমি হিসেবে নির্বাচন করেন। কালক্রমে এই নদীতীরে বৈদিক ঋষিদের একটি বড় পল্লী গড়ে ওঠে। বৈদিক ঋষিদের সম্মিলিত বেদপাঠ উক্ত স্থান মুখরিত করে রাখত বলে উক্ত স্থান বাগ্দেবীর আবাস হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। বেদের টীকাকারদের মতে এই নদীটি সেকালে-একালের গঙ্গা নদীর মতোই পূজিত হত। তবে, আর্যরা এই নদীকে জ্ঞান উদ্দীপনা বা বাক্যের উৎপাদয়িত্রা হিসেবেই পূজা করেছেন। 
.
কালক্রমে বিভিন্ন উপ্যাখ্যানের সূত্রে এই নদীকে দেবী সত্তায় উন্নীত করা হয়েছে। ঋগবেদের ১।১৪২।৯ মন্ত্র তে বাক-দেবী হিসেবে তিনটি নাম পাওয়া যায়। এরা শুচি ও দেবগণের মধ্যস্থা নামে অভিহিত হয়েছেন। এই তিন দেবী হলেন, ভারতী স্বর্গস্থ বাক, ইলা পৃথিবীস্থ বাক এবং সরস্বতী অন্তরীস্থ বাক। গরুড় পুরাণের সপ্তম অধ্যায় মতে, সরস্বতীর আটটি শক্তি বিদ্যমান। এই শক্তিগুলো হল- শ্রদ্ধা, ঋদ্ধি, কলা, মেধা, পুষ্টি, প্রভা ও মতি।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

No comments:

Post a comment