আর্য সমাজের আদর্শ পুরুষ ছিলেন মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী - VedasBD.com

Breaking

Tuesday, 10 December 2019

আর্য সমাজের আদর্শ পুরুষ ছিলেন মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী


বর্তমানে অধিকাংশ হিন্দু ধর্মাম্বলীদের অজ্ঞতায় হলো তাদের দুর্দশার প্রধান কারণ। এছাড়া অধিকাংশ হিন্দুই কখনো শাস্ত্র অধ্যয়ন করে না, বরং তাদের প্রচলিত প্রথা তথা কুসংস্কারকে প্রাধান্য  দিয়ে চলতে থাকে। আর এই কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে কিছু কুচক্রী  নামধারী হিন্দুত্ববাদী ব্যবসায়ীগণ সর্বদা এইসব কুসংস্কার বাঁচিয়ে রেখে তাদের নিজেদের পেট চালাতে ব্যস্ত থাকে। যখনই হিন্দুদের প্রকৃত জ্ঞানের পথ দেখানোর চেষ্টা করা হয়, তখনই তাদের মধ্যে কেও কেও কেঁদে কেঁদে কান্নার নদী তৈরি করে আবার কেও কেও ব্যাঙের মতো লাফাতে থাকে এবং সারমেয়ের ন্যায় চিৎকার করে।
.
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর জ্ঞান, সমাজ সংস্কার ও
বেদভাষ্যের জন্য ভারতের ইতিহাসে মহান স্থান জুড়ে আছেন এছাড়া মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী কে আধুনিক ভারতের পিতামহ বলা হয়ে থাকে। কারণ তাঁর রচিত বেদভাষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন মুসলিম ও খ্রিস্টানরা বেদ নিয়ে অপপ্রচার করতে থাকে তখন সেইসব অপপ্রচারকারীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে সকল হিন্দু ধর্মাম্বলী গণ মহর্ষি দয়ানন্দ
সরস্বতী তথা আর্যসমাজের বেদভাষ্য ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় পূর্বোক্ত সেই সকল ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীগণও নিজেদেরকে বাঁচাতে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তথা আর্য সমাজের বেদভাষ্য ব্যবহার করে থাকেন। আবার একইভাবে সেইসব ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীগণ নিজেদের ব্যবসা ঠিক রাখার জন্য মহর্ষির বিরুদ্ধেও অপপ্রচার করতে সদা প্রস্তুত থেকে থাকে। সেই সকল ভণ্ডরা যখনই মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়, তখনই তাদের অপপ্রচার করা যুক্তি সমূহকে আর্য সমাজের বেদ ভাষ্য দ্বারা খণ্ডন করে জবাব দিয়ে তাদের দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়। এখন তাঁরা নতুন গান ধরেছে, দয়ানন্দ সরস্বতীকে কেন মহর্ষি বলা হয়। দয়ানন্দ সরস্বতী কে মহর্ষি বলা নাকি অশাস্ত্রীয়। আবার সেইসব মূর্খরা নিজেদের কে জ্ঞানী বলে দাবি করে থাকে কিন্তু তাদের জ্ঞানের লেভেল যে অত্যন্ত নিম্নমানের তা আজকের সম্পূর্ণ পোস্ট টি পড়লে পরিষ্কার হয়ে যাবে । এখন প্রথম প্রসঙ্গটি হল ঋষি শব্দটি নিয়ে। আমরা সকলে জানি, সংস্কৃত ভাষায় একটি শব্দের একাধিক সমার্থক অর্থ থাকে। তেমনই প্রাচীন শাস্ত্রে 'ঋষি' শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে।
.
নিরুক্তে বলা আছে, "ঋষিণাং মন্ত্রদৃষ্টয়োভবন্তি" [নিরুক্ত- ৭।৩] অর্থাৎ নানা প্রকার অর্থ দ্বারা ঋষিদের মন্ত্রদর্শন হয়। এটি সাধারনত বৈদিক ঋষিদের মুখ্যার্থ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হতে পারে, বেদমন্ত্র দ্রষ্টা ছাড়া অন্য মানুষও কি হতে পারেন ঋষি? এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ অবশ্যই হতে পারেন। কারণ রামায়ণ মহাভারত সহ বিভিন্ন গ্রন্থে ব্যাসদেব, যাজ্ঞবল্ক্য প্রমুখকে অসংখ্য বার মহর্ষি, ঋষি ইত্যাদি বলা হয়েছে। এর তালিকা এতই দীর্ঘ যে তা এখন লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। এনারা  কিন্তু বেদ মন্ত্র দ্রষ্টা ছিলেন না। আবার মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে 'মহষয়ঃ' শব্দের ভাষ্য করতে গিয়ে মেধাতিথি লিখেছেন,
.
 "ঋষির্বেদঃ তদধ্যয়ন বিজ্ঞান তদার্থনুষ্ঠানাতিশয়যোগাৎ পুরুষেহপ্যৃষিশব্দঃ।" অর্থাৎ বেদ অধ্যয়ন, বিজ্ঞান, অর্থানুষ্ঠান ইত্যাদির কারণে  পুরুষের উপরে ঋষি শব্দের প্রয়োগ হয়। মেধাতিথির এই উক্তি থেকে প্রমাণ হয়, যে কোনো মানুষ যদি বেদজ্ঞানী হয়, তবে তাঁর উপর ঋষি শব্দের প্রয়োগ হতে পারে। আবার ঋষি বলতে এমন জ্ঞানীদের বোঝায়, যারা বেদের  মন্ত্রের অর্থ বা তাৎপর্য সঠিক ভাবে জানতে পারেন। এই বিষয়ে শতপথ ব্রাহ্মণে [৬।১।১।১] বলা আছে—
"তে যৎ পুরা অস্মাৎ সর্বস্মাৎ ইদমিচ্ছন্তঃ শ্রমেণ
তপসারিং ষতস্মাদ্ ঋষয়ঃ।" অর্থাৎ প্রাচীন সময়ে যাঁরা বেদমন্ত্রের তাৎপর্য জানতে কঠোর পরিশ্রম , তপস্যা ও ধ্যান করেছিলেন, তাঁদেরই ঋষি বলা হয়। শতপথের এই বাক্যদ্বয় থেকেও স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র মন্ত্র দ্রষ্টাই ঋষি নন, যারা কঠোর পরিশ্রম বা তপস্যা করে বেদ মন্ত্রের সঠিক তাৎপর্য জানতে পারেন, তাঁরাই ঋষি। আর এখন যদি আমরা বেদজ্ঞানী বা বেদ মন্ত্রের সঠিক অর্থের কথা বলি, তবে এক বাক্যেই স্পষ্ট যে, দয়ানন্দ সরস্বতীজীর বেদভাষ্যেই বেদের প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পেয়েছে আর দয়ানন্দজীর এই বেদভাষ্য রচনার পেছনে ছিলো তাঁর দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম। তিনি নিরুক্ত, নিঘণ্টু, অষ্টাধ্যায়ী, মহাভাষ্য, ব্রাহ্মণাদি অধ্যয়ন করেছেন। এরপরেই তিনি তার বেদভাষ্য রচনার মাধ্যমে বেদ মন্ত্রের প্রকৃত অর্থ তুলে ধরেছেন। তাই শতপথ ব্রাহ্মণের উপর্যুক্ত বচন থেকে দয়ানন্দজীর উপর মহর্ষি শব্দ  সিদ্ধ হয়।
.
এছাড়া বেদজ্ঞানী মানুষ যে ঋষিপদ বাচ্য, এই বিষয়েও
আরও প্রমাণ রয়েছে। বোধায়ন ধর্মসূত্রের ২।৬।৩৬ সূত্রে
ঋষি শব্দটি রয়েছে। এর ব্যাখ্যায় গোবিন্দ স্বামী
লিখেছেন, 'ঋষি মন্ত্রার্থজ্ঞঃ'। অর্থাৎ বেদ মন্ত্র অর্থের জ্ঞাতাই হলেন ঋষি। এখন মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী যে বেদ মন্ত্রের সঠিক অর্থের জ্ঞাতা ছিলেন সেটি প্রমাণের জন্য বেশিদূর যেতে হবে না। শুধুমাত্র যজুর্বেদের ২৩ অধ্যায়ের ২১ থেকে ৩০ নং মন্ত্রের অর্থ গুলো মহীধরের ভাষ্যের সাথে দয়ানন্দ স্বরস্বতীর ভাষ্যের তুলনা করলে যে কেও বুঝতে পারবে। এরপরও যেসব ভণ্ড, ধর্মব্যবসায়ীরা দয়ানন্দজীর বেদার্থ জ্ঞান নিয়ে সন্দেহ করে তাদের ডিএনএ টেস্ট করলে নিশ্চয়ই ঘোড়ার জিন পাওয়া যাবে। অবশ্য ঘোড়ার জিন পাওয়ার কারণ যজুর্বেদের ২৩।২১-৩০ উব্বট, মহীধরের ভাষ্য পড়লেই বুঝতে পারবেন আশা করি। এরপরও যদি সেইসকল কুৎসারটনাকারীগণ ঋষি শব্দের এই অর্থ স্বীকার করতে না চান, তবে তারও ব্যবস্থা আছে। এইসব ব্যবসায়ীদের পিতা উব্বট সায়নাচার্য লিখে গেছেন যে,—
"ব্রাহ্মণমদ্য বিদেয়ং পিতৃমন্তং পৈতৃমত্যমৃষিমার্ষেয়ম্" (যজুর্বেদ ৭।৪৬)  ঋষি শব্দের ভাষ্যে উব্বট সায়নাচার্য লিখেছেন, "ঋষির্মন্ত্রাণাং
 ব্যাখ্যাতা"। অর্থাৎ ঋষি হচ্ছেন মন্ত্রের ব্যাখ্যা কর্তা। এখন প্রশ্ন হল সেইসব কুস্বভাবধারী ব্যক্তিগণ কি তাদের কাছে ঋষি? দয়ানন্দজীর বেদ ব্যাখ্যা যে কি পরিমাণ অতুলনীয় তা শুধু তাঁর 'ঋগ্বেদাদি ভাষ্যভূমিকা' গ্রন্থটি পড়লে সহজেই বুঝতে পারা যায়। এমনকি সেইসব ধর্মব্যবসায়ী, যারা বেদে ইতিহাস খোঁজে, তাদের পশ্চিমা পিতা ম্যাক্সমুলারও মহর্ষি দয়ানন্দ স্বরস্বতীর ঋগ্বেদাদি ভাষ্যভূমিকা পড়ে বলেছেন, "সংস্কৃত সাহিত্য শুরু হয় ঋগ্বেদ দিয়ে এবং শেষ হয় দয়ানন্দের ঋগ্বেদাদি ভাষ্যভূমিকা দিয়ে।" [উৎস- ম্যাক্সমুলারের 'আমরা ভারত থেকে কি শিখবো' নামক সংকলিত ভাষণের তৃতীয় ভাষণ] এছাড়াও Max Muller এর লেখা তাঁর কিছু পছন্দের ব্যক্তির জীবনী দেখুন যার ভেতর দয়ানন্দ জী স্থান পেয়েছেন
https://archive.org/details/biographicaless01mlgoog/page/n7
আমরা Max Mullerএর আদর্শ হয়তো সমর্থন করি না, বা উনি ও পুরোপুরি আর্যসমাজের আদর্শ মানেন নি; উনি প্রথম জীবনে খৃস্টান মিশনারিদের কাজ নিয়ে ভারতে আসলেও শেষ জীবনে অনুরক্ত ছিলেন বেদ ও সনাতনী শাস্ত্র নিয়ে। তাঁর Gifford Lectures এ তিনি বলেছেন,
.
"বেদ যে সময়েই আসুক না কেন, বেদের বাণীর ঐশ্বরিকত্ব ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কেউ সন্দেহ করতে পারবে না।"এবার আসি অন্য দিকে, নিরুক্ত পরিশিষ্টে বলা হয়েছে,

"মনুষ্যা বা ঋষিষূৎক্রামৎসু দেবানব্রুবননকো ন
ঋষির্ভবিষ্যতীতি, তেভ্য এতং তর্কঋষিং প্রায়চ্ছন্মন্ত্
রার্থ চিন্তাভ্যূহমভ্যূঢম্। তস্মাদ্যদেবং কিং
চানূচানোঽভ্যূহ ইত্যার্ষং তদ্ধবতি।।"
[নিরুক্ত- ১৩।১২ তথা নিরুক্ত- ১।১২]

– অর্থাৎ এখানে বলা হয়েছে প্রাচীন কালে মনুষ্যগণ দেবতাদের অর্থাৎ বিদ্বানদের) প্রশ্ন করেছিলেন যে, মনুষ্যদের মধ্যে কারা ঋষি হবেন। এর উত্তরে দেবতাগণ (বিদ্বানগণ) বলেছিলেন যে, তর্কই ঋষি। অর্থাৎ যাঁরা তর্কের মাধ্যমে গবেষণা পূর্বক বেদের সঠিক অর্থ বুঝতে পারবেন, তাঁরাই আর্ষ ঋষি।
.
নিরুক্ত-১।১২ এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, তর্কের মাধ্যমে যাঁরা বেদার্থ জ্ঞাত হন, তাঁরাই ঋষি। এখন দয়ানন্দজীর জীবনী যদি আপনারা দেখেন, তবে দেখতে পারবেন তিনি এক জীবনে সহস্রাধিক তর্কসভায় অংশ গ্রহণ করেছেন এবং বিজয়ী হয়েছিলেন। এমনকি এমনও অবস্থা হয়েছে, মহর্ষির সাথে তর্কে না পেরে তৎকালীন  অনেক কূটকৌশল, মিথ্যা ছলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাই এমন সুতার্কিক বেদজ্ঞকে কি মহর্ষি বলাটা অন্যায়, বা অশাস্ত্রীয় সেটা আপনারাই ভাবুন? উপরিউক্ত তথ্যসমূহ বিবেচনা করলে দেখা যায় যে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী বৈদিক আর্য সমাজের কঠোর পরিশ্রমী ও আদর্শ পুরুষ ছিলেন।

No comments:

Post a comment