সম্ভূতি অসম্ভূতি বিষয় নিয়ে ভ্রান্তি নিবারণ - VedasBD.com

Breaking

Tuesday, 15 October 2019

সম্ভূতি অসম্ভূতি বিষয় নিয়ে ভ্রান্তি নিবারণ


যজুর্বেদ ৪০ অধ্যায়ের ৯ - ১১ (ঈশোপনিষদ ১২-১৪ ) মন্ত্রে  সম্ভূতি অসম্ভূতি বিষয় নিয়ে এক ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয় টি এরূপ যে, ৯ম মন্ত্রে সম্ভূতি অসম্ভূতির ফল অন্ধকার বর্ণনা করেছে আবার ১১ নং মন্ত্রে  মৃত্যু জয় এবং মোক্ষপ্রাপ্তির বর্ণনা করা হয়েছে। যা দেখে সনাতন ধর্মাম্বলীদের মনে ভ্রান্তির উদয় হয়ে থাকে তারা ভেবে থাকে বেদে এরূপ পরস্পর বিরোধী উক্তি কিভাবে সম্ভব?
.
এ ভ্রান্তির মূল কারণ বেদ নয় বরং ভাষ্যকারদের বিক্ষিপ্ত ভুল অর্থ বা ভাষ্য যা পাঠকগণকে ভ্রমিত করেছে। এ ভ্রান্তি সমাধানের জন্য মন্ত্র ত্রয়ের যথার্থ অনুবাদ,  ভাবার্থ এবং এর উপর সমীক্ষা করে নিচে দেখানো হল -
.
অন্ধতমঃ প্র বিশন্তি যেসম্ভূতিমুপাসতে।
ততো ভূয়ইব তে তমো যউ সম্ভুতাংরতাঃ।। (ঈশোপনিষদ ১২)
.
অনুবাদঃ ঘোর অন্ধকারে প্রবেশ করে যে অনাদি প্রকৃতিকে উপাসনা করে। তাহার থেকেও অধিকতর ঐ অন্ধকারে প্রবেশ করে যে বিতর্কের সহিত  প্রকৃতির কার্য মধ্যে রত থাকে।।
.
ভাবার্থঃ কোন মনুষ্য ঘোর অন্ধকার কে প্রাপ্ত হয় - যে মনুষ্য পরমেশ্বর কে ছেড়ে অসম্ভূতি অর্থাৎ অনাদি, অনুৎপন্ন, প্রকৃতি নামক সত্ব, রজ, তমগুনাত্মক জড়বস্তু কে উপাস্য মানে, সে ঘোর অন্ধকার প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ অবিদ্যাকে প্রাপ্ত হয়ে সদা দুঃখী থাকে। এবং যে সম্ভূতি অর্থাৎ সেই কারন প্রকৃতি দ্বারা উৎপন্ন,  মহদাদি স্বরূপ মধ্যে পরিণত হয়ে সৃষ্টি অর্থাৎ পৃথিবী আদি স্থুল
জগত কার্য কারন রূপ সূক্ষ্ম অনিত্য সংযোগজন্ম কার্য জগৎ কে উপাস্য মানে।  এবং তাহার মধ্যে রমন করে সে তাহা থেকেও অধিক গাঢ় অবিদ্যা অন্ধকার কে প্রাপ্ত হয়ে দুঃখী হন। অতঃ সব মনুষ্যের উচিৎ সচ্চিদানন্দ স্বরূপ পরমাত্মাকে সদা উপাসনা করা
.
অন্যদেবাহুঃ সম্ভবাদন্য দাহুরসম্ভবাত্।
ইতি শুশ্রম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে।। 
(ঈশোপনিষদ ১৩)
.
অনুবাদঃ কার্য জগতের দ্বারা অন্যই ফল ইহা বলেন এবং প্রকৃতি দ্বারা অন্য ফল ইহা বলেন। ইহা ধীর পুরুষের থেকে আমরা শুনেছি, যে বিদ্বান পুরুষ আমাদের জন্য সেই তত্বের বিশেষরূপে ব্যাখ্যা করেছেন।।
.
ভাবার্থঃ মনুষ্যের উচিত যে -বিদ্বান মনুষ্য ধীর অর্থাৎ মেধাবী বিদ্বান যোগী জন দ্বারা যে সম্ভূতি বিষয়ক বচন শ্রবণ করে তার বিবেচনা করে সব মনুষ্যকে বোঝাবে। সম্ভব (সম্ভূতি)  অর্থাৎ সংযোগ দ্বারা উৎপন্ন কার্য জগৎ দ্বারা উক্ত বিদ্বান অন্য ফল বলবে। এবং অসম্ভব (অসম্ভূতি) অর্থাৎ অনুৎপন্ন কারন জগৎ  দ্বারা অন্য ফল বলবে। উক্ত বিদ্বান মনুষ্য সম্ভব (কার্যবস্তু) অসম্ভব (কারন বস্তু) দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বক্ষমান উপকার গ্রহন করে এবং করায়। কার্য বস্তু এবং কারন বস্তুর গুন কে স্বয়ং মেনে তাহার উপদেশ করবে। অতঃএব সব মনুষ্য কার্য এবং কারন বস্তুকে জানো ।।
.
সম্ভুতিং চ বিনাশং চ যস্তদ্বেদেভয়ং সহ।
বিনাশেন মৃত্যুং তীর্ত্বা সম্ভূত্যামৃতমশ্নুতে।।
(ঈশোপনিষদ ১৪)
.
অনুবাদঃ কার্য জগৎ কে এবং সুক্ষ্ম কারন জগৎ কে এই উভয় কে যে একসাথে জানে।  সে সুক্ষ্ম কারন জগৎ দ্বারা মৃত্যু ভয়কে উত্তীর্ণ করে এবং কার্য জগৎ দ্বারা মোক্ষ কে প্রাপ্ত হয় ।।
.
ভাবার্থঃ মানুষ কার্য এবং কারন দ্বারা কি সিদ্ধ করে - কার্য (সৃষ্টি) কারন (প্রকৃতি) নামক বস্তু নিরর্থক নয়। বিদ্বান মনুষ্য সম্ভূতি অর্থাৎ কার্য নামক সৃষ্টি এবং তার গুন, কর্ম, স্বভাব এবং বিনাশ (অসম্ভূতি) অর্থাৎ যাহার মধ্যে সব পদার্থ বিনষ্ট অর্থাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, সেই কারন রূপ প্রকৃতি এবং তার গুন কর্ম স্বভাব কে
জানে। বিনাশ (অসম্ভূতি) নিত্য প্রকৃতি কে জেনে মৃত্যু অর্থাৎ শরীরের বিয়োগ দ্বারা উৎপন্ন দুঃখকে পার করে। সম্ভূতি অর্থাৎ শরীর ইন্দ্রীয় এবং অন্তকরনরূপ উৎপন্ন কার্যজগত তথা ধর্ম মধ্যে প্রযত্নকারী সৃষ্টিকে জেনে ইহার সদুপযোগ করে মোক্ষের ফল প্রাপ্ত করে। এই দুই প্রকার কারন বস্তু দ্বারা মৃত্যু ভয় কে ত্যাগ এবং কার্য বস্তু দ্বারা মোক্ষের ফল সিদ্ধিরূপ ভিন্ন ভিন্ন ফল কে প্রাপ্ত করে। কারন এবং কার্য বস্তু পরমেশ্বরের স্থানে
উপাসনা করা নিষেধ পরন্ত ইহার উপযোগ নেওয়াতে
নিষেধ নয়।।
-
উপরোক্ত মন্ত্র ত্রয়ে সম্ভূতি এবং অসম্ভূতির উপযোগ কে বোঝানো হয়েছে। ইহার মধ্যে প্রথম মন্ত্রে বলা হয়েছে যে  অসম্ভূতির উপাসনা করে সে ঘোর অন্ধকারে প্রবিষ্ট হয় এবং যে মনুষ্য অসম্ভূতি মধ্যে রত সে তাহা থেকেও অধিক ঘোর অন্ধকারে প্রবিষ্ট হয়। এবং দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হয়েছ যে, মেধাবী বিদ্বান যোগী জন আমাদের জন্য সম্ভূতি এবং অসম্ভূতির উপদেশ করেছেন, এইরূপ আমরা শুনেছি যে,সম্ভূতির ফল ভিন্ন এবং অসম্ভূতির ফল ভিন্ন। এবং তৃতীয় মন্ত্রে সম্ভূতি এবং অসম্ভূতিকে এক সাথে জেনে নেয়, তিনি অসম্ভূতি দ্বারা মৃত্যুর ভয় কে পার করে। এই প্রকার এই মন্ত্রে সম্ভূতি এবং অসম্ভূতির ফলের বর্ণনা করা হয়েছে। এখন এখানে প্রশ্ন উৎপন্ন হয় যে, অসম্ভূতি এবং সম্ভূতি কি বস্তু? ভাষ্যকারগণ ইহার যে ব্যাখ্যা করেছে, তার মধ্যে পর্যাপ্ত ভিন্নতা রয়েছে। মহর্ষি দয়ানন্দজীর ভাষ্য অনুসারে অসম্ভূতি অর্থ প্রকৃতি, যা কখনো  উৎপন্ন না হবার কারণে অনাদি। ইহা জড় বস্তু। এই প্রকৃতি দ্বারা যে মহত্তত্বাদি উৎপন্ন হয় তাকে সম্ভূতি বলে। এই মহত্তত্বাদি প্রকৃতি থেকে সম্ভূত = উৎপন্ন হবার কারণেই সম্ভূতি বলা হয়। উক্ত অসম্ভূতি এবং সম্ভূতি আত্মার জন্য কিরূপ উপযোগ , তাহা প্রথম মন্ত্রে বলা হয়েছে যে অসম্ভূতি = প্রকৃতির উপাসনা করে, সে ঘোর অন্ধকারে প্রবিষ্ট হয়, অর্থাৎ সে অবিদ্যাগ্রস্ত হওয়ার দ্বারা সর্বদা দুঃখী হয়ে থাকে।আর যে সম্ভূতি =প্রকৃতির কার্য পৃথিবী আদি জড় বস্তুতে লেগে থাকে সে তাহা থেকেও ঘোর অন্ধকারে প্রবেশ করে। অতঃএব আত্মার জন্য অসম্ভূতি এবং সম্ভূতি দুইই উপাসনীয় বস্তু নয়। কিন্তু এক চেতন পরমাত্মাই উপাসনার যোগ্য। দ্বিতীয় মন্ত্রে অসম্ভূতি এবং সম্ভূতির ভিন্ন ভিন্ন ফল বলে তার উপযোগ বর্ণনা করা হয়েছে। তৃতীয় মন্ত্রে তাহার ফল বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, অসম্ভূতি এবং সম্ভূতি আত্মার জন্য উপাসনীয় নয়, কিন্তু অত্যন্ত উপযোগী।আত্মা কে এই দুই এর সাথে সাথে জ্ঞান প্রাপ্তি করে ইহার উপযোগ নেওয়া উচিৎ। তৃতীয় মন্ত্রে অসম্ভূতির স্থলে " বিনাশ " শব্দের পাঠ রয়েছে। কারণ সব উৎপন্ন পদার্থ প্রলয়ে প্রকৃতির মধ্যে বিনাশ = লয় প্রাপ্ত হয়। যে এই বিনাশের বিজ্ঞান অর্থাৎ সৃষ্টির কারন কার্য ভাব কে জেনে নেয়। তিনি অবিদ্যাদি কলুষ থেকে বাঁচার কারণে মৃত্যু কে পার করে যায়। এবং সম্ভূতি= প্রকৃতির কার্য পদার্থের আত্মা বিদ্বান কে সংগতি মধ্যে অবস্থান করে বেদোক্তবিধি দ্বারা ঠিক ঠিক উপযোগ করে তো তিনি অমৃত= মোক্ষ কে প্রাপ্ত করে। এই তিন মন্ত্র দ্বারা স্পষ্ট যে অসম্ভূতি আত্মার জন্য উপাসনীয় বস্তু নয়, কিন্তু উপযোগী অবশ্যই।
.
এই মন্ত্রের ব্যাখ্যাই শ্রী শঙ্করাচার্য জী সম্ভূতি এবং অসম্ভূতি কে উপাসনার ফল অনিমাদি ঐশ্বর্য প্রাপ্তি আদি বর্ণনা করেছেন। যখন ইহার প্রথম মন্ত্রেই সম্ভূতিকে উপাসনাকারী কে ঘোরতম অন্ধকারে প্রবেশ করে বলা হয়েছে। তখন তার দ্বারা ঐশ্বর্য প্রাপ্তি কিভাবে সম্ভব? আর তৃতীয় মন্ত্রে " উপাসনা" শব্দই নেই। এই মন্ত্রের মধ্যে উপযোগরূপ ফলের সঙ্কেত করা হয়েছে তার ফল তো আগের মন্ত্রেই বর্ণনা করা হয়েছে। তাহার কি ফল সেটার মধ্যে এবং পূর্বক্ত মন্ত্র প্রোক্ত ফলের মধ্যে সমতা রয়েছে? যদি না হয় তবে তাহার ব্যাখ্যা মূল মন্ত্রের বিরুদ্ধে চলে যায়। বাস্তবে তৃতীয় মন্ত্রে তাহার উপযোগীতার বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ অসম্ভূতি বিজ্ঞান দ্বারা মৃত্যুকে পার করে। এবং সম্ভূতি বিজ্ঞান দ্বারা মোক্ষ কে প্রাপ্ত করা যায়। এজন্য মন্ত্রে " বেদ= জানা " ক্রিয়া রয়েছে, উপাসনা নয়।
.
এছাড়া আমরা জানি ব্রহ্ম ও প্রকৃতি দুইটা ভিন্ন সত্তা ব্রহ্ম শুধুমাত্রই পরোক্ষ অর্থাৎ চেতন কিন্তু প্রকৃতি হল জড় বস্তু যা কোনভাবেই উপাসনার যোগ্য নয় তাই প্রকৃতিকে অসম্ভূতি বলা হয়। তবে ব্রহ্ম জীব ও প্রকৃতিতে সর্বত্রই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বিরাজমান। তাছাড়া গীতা ও বেদে বলা হয়েছে→
.
প্রকৃতিম্‌ স্বাম্‌ অবষ্টভ্য বিসৃজইম পুনঃ পুনঃ ।
ভূতগ্রামম্‌ ইমম্‌ কৃত্স্নম্‌ অবশম্‌ প্রকৃতেঃ বশাত্ । (গীতা ৯।৮)
.
অনুবাদঃ- হে-কৌন্তেয় কল্পান্ত সমস্ত জড় বস্তু আমারই প্রকৃতে প্রবেশ করে,এবং পুনরায় কল্পারম্ভে প্রকৃতির দ্বারা আমি তাদের সৃষ্টি করি।
.
ইদং বিষ্ণুর্বিচক্রমে ত্রেধা নি দধে পদম্।
স মূঢ়মস্য পাংসুরে।। (ঋগ্বেদ,১।২২।১৭)
.
অনুবাদঃ- সর্বব্যাপক পরমাত্মা এই প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ জগৎকে বিশেষ ক্রমপূর্বক রচনা করিয়াছেন। স্থূল সুক্ষ্ম ও কারণ এই তিন প্রকারের এবং সুক্ষ্মরেণু পূর্ণ আকাশে সুব্যবস্থিত জগৎকে তিনি ধারণ করিয়াছেন।
.
→উপরিউক্ত শ্লোক ও মন্ত্র থেকে স্পষ্টভাবে সিদ্ধ হয় যে ব্রহ্ম প্রকৃতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সর্বত্রই বিরাজমান আছেন।
.
দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায় সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্তি-অনশ্নন্নন্যো অভি চাকশীতি।।
 (ঋগ্বেদ ১।১৬৪।২০)
.
অনুবাদঃসুন্দর পক্ষবিশিষ্ট সম সম্বন্ধযুক্ত দুইটি পক্ষী মিত্র রূপে একই বৃক্ষ আশ্রয় করিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একটি বৃক্ষের ফলকে স্বাদের জন্য ভক্ষণ করে এবং অন্যঢী ফলকে ভক্ষণ না করিয়া সব দিক দেখিতে থাকে।
.
ভাবার্থঃ— বৃক্ষটি শরীর এবং দুইটি পক্ষীর একটি জীব, অন্যটি ব্রহ্ম বা পরমাত্মা। জীব ও ব্রহ্ম উভয়ই অনাদি।  উভয়ই সখা স্বরূপ। জীব সংসারে পাপ পুণ্যের ফলভোগ করে এবং ব্রহ্ম ফল ভোগ না করিয়া সাক্ষী রূপে বর্ত্তমান।
.
উপরিউক্ত বেদের মন্ত্র থেকে সিদ্ধ হয় এটাই যে জীব কোনভাবেই ব্রহ্ম নয়। অর্থাৎ ব্রহ্ম প্রকৃতি ও জীব ভিন্ন সত্ত্বা।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

No comments:

Post a comment