শ্রীকৃষ্ণই কি শুধু বিশ্বরূপ দর্শন দেখিয়েছেন? - VedasBD.com

Breaking

Wednesday, 18 September 2019

শ্রীকৃষ্ণই কি শুধু বিশ্বরূপ দর্শন দেখিয়েছেন?


শ্রীকৃষ্ণ যেমন তার দিব্য শক্তি দ্বারা বিশ্বরূপ দর্শন দেখিয়েছিলেন ঠিক তেমনি অনেকেই দেখিয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের দিব্য তেজ সহ্য করা সাধারন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে একটি বিশেষ শক্তি ও চক্ষু প্রদান করেছিলেন যাতে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের তেজ সহ্য করতে পারেন। ঠিক তেমনই ভাবে শিব বিষ্ণু ব্রহ্মা গনেশ বামন অবতার ও দক্ষের কন্যা ইত্যাদি একইভাবে তাদের বিশেষ দিব্য শক্তি প্রদান করে তাদের অনুসারীগণ দের বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছেন নিচে পয়েন্ট অনুসারে ব্যাখ্যা করা হলো:–

১।শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতে কৌরব সভায় বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন–

.
২। ভাগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন-

৩। বামন আবতার কতৃক বলিকে বিশ্বরূপ দর্শণঃ (ভাগবত ৮।১৪)
.
এগুলো ছিলো সব বিষ্ণুর অবতারের উদাহরণ পুরান মতে একমাত্র বিষ্ণু/কৃষ্ণই কিন্তু শুধুমাত্র বিশ্বরূপ প্রদর্শন করেননি আরো অনেকেই করেছেন নিচে সেগুলো দেওয়া হল–
.
৪। গণেশ গীতাতে গণেশ রাজা বরেণ্যকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন:
.
অসংখ্যবক্ত্র ললিতমসংখ্যাঙ্ঘ্রি কবং মহৎ।
অসংখ্যনয়নং কোটীসূর্যরশ্মিধৃতাষুধম্। (গণেশ গীতা - ৮।৬-৭)
.
৫। মার্কেন্ডেও পূরাণে চন্ডির যে বর্ণনা আছে তা বিশ্বরূপের আনুরূপ। ব্রহ্মা চন্ডিকে স্তুতি করে বলছেনঃ

ত্বষৈব ধার্যতে সর্বং ত্বষৈতৎ সূজ্যতে জগৎ।
ত্বষৈতৎ পাল্যত দেবি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা।। (চণ্ডী- ১। ৬৮-৬৯)

-হে দেবী, তুমিই সবকিছু ধারণ কর, তুমি জগৎ
সৃষ্টি কর, তুমিই পালন কর, তুমিই প্রলকালে
গ্রাস কর।
.
 একৈবাহং জগত্যাত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা।
পৈশ্যৈতা দুষ্ট ময়েব্য বিশস্ত্যা মদবিভূতয়:।। (চণ্ডী - ১০। ৮)

- এই জগতে আমি একাই, আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কে আছে? এই দুষ্ট দেখো- আমার বিভূতি আমাতেই প্রবেশ করছে।

৬।বরাহ পুরাণে শিবের বিশ্বরূপ প্রদর্শিত হয়েছে:
.
প্রদেশমাত্রং রুচিরং শতশীর্ষং শতোদবম্।।
সহস্রবাহুচরণং সহস্রাক্ষিশিরোমুখম্।
অনীযসামণীযাংসং বৃহদবহদ্ বৃহত্তবম্। (বরাহ পুরাণ - ১।৯।৬৮)

- শিব এখানে প্রোদেশ প্রমাণমাত্র হয়েও শতশীর্ষ, শত উদর বিশিষ্, সহস্র বাহু, সহস্র পদ, সহস্র চক্ষু, সহস্র মস্তক ও সহস্র মুখ সমন্বিত। অণু থেকে ক্ষুদ্র হয়েও সর্ববৃহৎ।
.
৭।বায়ু পুরাণেও শিবের বিশ্বমূর্তি বর্ণিত হয়েছে:
.
অব্যক্তং বৈ যস্য যোনিং বদন্তি ব্যক্তং দেহং কালমন্তর্গতঞ্চ।
বহ্নিং বক্ত্রং চন্দ্রসূর্যৌ চ নেত্রে দিশ: শ্রোত্রে ঘ্রাণমাহুশ্চ বায়ুম্।।
বাচো বেদাংশ্চান্তরীক্ষং শরীরং ক্ষিতিং পাদৌ তারকা বোমকূপান্।। (বায়ু পুরান - ১।৯।৬৮)

- শিবের উৎপত্তি অব্যাক্ত, তার দেহ ব্যাক্ত অর্থাৎ প্রকাশিত। তার দেহের অন্তর্গতসমূহ কাল। অগ্নি তাঁর মুখ, চন্দ্র ও সূর্য তার
নেত্রদ্বয়, দিকসমূহ তাঁর কর্ণ, বায়ু তার ঘ্রাণ, বেদ তার বাক্য, অন্তরীক্ষ শরীর, পৃথিবী পদদ্বয়, তারকাগণ রোমকূপ।
.
৮।বামন পূরাণে শিবের বিশ্বরূপ :
.
ত্বমেব বিষ্ণুশ্চতুবাননতস্তৃং ত্বমেব মৃত্যুর্বদদস্তৃমেব।।
ত্বমেব যজ্ঞো নিবমস্তমেব। ত্বমেব ভূতং ভবিতা ত্বমেব।।
ত্বমেব সূর্যো রজনীকরশ্চ। ত্বমেব ভূমিঃ সলিলং ত্বমেব।
স্থুলশ্চ সুক্ষ্মঃ পুরুষস্তৃমেব।। (বামন পু: ৫৪।৯৬-৯৮)

- তুমিই বিষ্ণু, তুমিই ব্রহ্মা, তুমিই মৃত্যু, তুমিই বরদ, তুমি সূর্য ও চন্দ্র, তুমি ভূমি, তুমি জল, তুমি যজ্ঞ, নিয়ম, তুমি অতীত, ভবিষ্যৎ, তুমি আদি ও অন্ত, তুমি সূক্ষ্ম ও স্থুল, তুমিই (বিরাট) পুরুষ।
.
৯।পদ্মপুরাণে ব্রহ্মার বিশ্বরূপের বর্ণনা:
বক্ত্রাণ্যনেকানি বিভো তবাহং পাশ্যামি যজ্ঞস্য গতিং পুরাণম্।
ব্রহ্মাণমীশং জগতাং প্রসূতিং নমোহস্তু তুভ্যং প্রপিতামহায়।।
( পদ্মপুরাণ সৃষ্টি খণ্ড - ৩৪।১০০)

– হে বিভু, আমি দেখছি তোমার অনেক মুখ, তুমি যজ্ঞের গতি, তুমি পুরাণ পুরুষ, তুমি ব্রহ্মা, ঈশ, জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা। প্রপিতামহ, তোমাকে নমস্কার।

১০।গণেশ গীতাতে গণেশকে ব্রহ্মস্বরূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গণেশ নিজের স্বরূপ বর্ণনা করছেন:
.
শিবে বিষ্ণৌ চ শক্তৌ চ সূর্যে মযি নরাধিপ।
যা ভেদবুদ্ধির্যোগঃ স সম্যগ্ যোগো মতো মমো।।
অহমেব জগৎ যস্মাৎ সৃজামি চ পালয়ামি চ।
কৃত্বা নানাবিধিং বিষং সংহরামি স্বলীলয়া।।
অহমেব মহাবিষ্ণুবহমেব সদাশিবঃ।
অহমেব মহাশক্তিরহমেবার্ষিমা প্রিয়।। (গণেশ গীতা - ১।২০-২২)

- হে রাজন। শিব, বিষ্ণু, শক্তি এবং সূর্যে যে ভেদবুদ্ধি সে আমারই সৃষ্টি, যেহেতু আমিই জগৎ সৃষ্টি করি, হে প্রিয়। আমিই মহা বিষ্ণু, আমিই সদাশিব, আমিই মহাশক্তি, আমিই
অর্যমা।
.
১১। দক্ষের কন্যা সীতা জন্মের পরেই দক্ষকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন:–
.
কোটী-সূর্যপ্রতীকাশং তেজোবিম্বং নিরাকূলম্ ।
জালামালা সহস্রাঢ্যাং কালানল শতোপমম্।।
দংষ্ট্রাকবাল দুর্ধর্ষং জটামণ্ডলমণ্ডিতম্।
ত্রিশূলববহস্তঞ্চ ঘোবরূপং ভয়ানকম্।।
সর্বত: পাণি-পাদন্তং সর্বতোহক্ষিশিবোমুখম্।
সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠন্তীং দদর্শ পরমেশ্ববীম্।।
(কূর্মপুরাণ, পূর্বভাগ ১২।৫২-৫৩,৫৮)

১২।মহাভারতের মার্কেণ্ডেয়-কৃত কার্তিকেয় স্তবে কার্তিকেয়ে বিশ্বমূর্তিরূপে বন্দিত হয়েছেনঃ
.
ত্বং পুরস্করাক্ষরস্ত্বরবিন্দবক্ত্রঃ সহস্রবক্ত্রোহসি সহস্রবাহুঃ।
ত্বং লোকপালঃ পরমং হবিশ্চ ত্বং ভাবনঃ সর্বসুরাসুরাণাম্।।
( মহাভাঃ বনপর্বঃ ২৩১, অঃ৪৩)

-তুমি পদ্মপলাশলোচন, তুমি অরবিন্দতুল্যমুখ বিশিষ্ট, তোমার সহস্র বদন,সহস্র বাহু, তুমি লোকপাল, শ্রেষ্ঠ হরি, সকল দেব ও অসুরগণের আবাধ্য।
.
১৩। লিঙ্গপুরাণ পূর্বভাগের ৩৬ তম অধ্যায়ে বর্ননা করা হয়েছে–
.
শ্রীবিষ্ণু ব্রাহ্মণবেশে দধীচি মুনির নিকট এসে বললেন - আমি আপনার নিকট বর প্রার্থনা করি আমাকে বর প্রদান
করুন।  দধীচি মুনি বললেন রুদ্রদেবের অনুগ্রহে ভূত ভবিষ্যত আমি জানি।  আপনাকে আমি চিনিতে পারিয়াছি আপনি স্বরূপে ফিরে আসুন। আপনি কৃপা করে বলুন শিব আরাধনা
পরায়ন ব্যক্তির কোন ভীতি থাকে?  আমি কাহারও সমীপে ভয় পাই না। তখন বিষ্ণু ছদ্মবেশ ত্যাগ করে বললেন - হে বিপ্র আমি
জানি তুমি কাহারো নিকট ভয় পাও না তবুও তুমি সভামধ্যে ক্ষুপভূপতিকে বলো আমি ভয় পাইতেছি।  তখন মহামুনি বললেন আমি ভয় পাইনা।  তখন বিষ্ণু ক্ষুব্ধ হইয়া মহামুনিকে চক্র
উত্তোলন করে মারতে উদ্যত হলেন। তখন মুনির সহিত ভয়ানক যুদ্ধ বাধলো।  অতপরঃ বিষ্ণু মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি
ধারন করলেন—

ততো বিস্ময়নার্থায় বিশ্বমূর্তিরবূদ্ধরিঃ।
 তস্য দেহে হরেঃসাক্ষাদপশ্যদ্বিজসত্তমঃ।।৫৮।।
দধীচী ভগবান্বিপ্রঃ দেবতানাং গণনা পৃথক।
রুদ্রাণাং কৌটয়শ্চৈব গণনাং কৌটয়স্তদা।।৫৯।।

–অনন্তর হরি মুনির বিস্ময় সাধনার্থে বিশ্বমূর্তি ধারন করলেন। মুনিবর ভগবান দধিচী নারায়ন শরীর মধ্যে পৃথক পৃথক
দেবতা,  কোটি কোটি রুদ্র এবং কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড অবলোকন করলেন। অতঃপর দধীচি মুনি মুনি বললেন -

মায়াং ত্যজ মহাবাহো প্রতিভাসা বিচারতঃ।
বিজ্ঞানানাং সহস্রাণি দুর্বিজ্ঞেয়াণি মাধবঃ।।৬২।।
ময়ি পশ্য জগৎসবৈ ত্বয়া সাধমনিন্দিত।
ব্রহ্মাণং চ তয়া রুদ্রং দিব্যাং দৃষ্টি দদামি তে।।৬৩।।

–হে মহাবাহো! বিচারপূর্বক প্রতিভা দ্বারা মায়া ত্যাগ করুন,  হে মাধব!  বিজ্ঞানসহস্র নিতান্ত দূর্বিজ্ঞেয়। হে অনিন্দিত! আমি
তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দান করিতেছি,  তুমি আমার শরীর মধ্যে তোমা সহ সমস্ত জগৎ ব্রহ্মা, রুদ্র এই সকল অবলোকন করো।

ইত্যুক্তত্বা দর্শয়ামাস স্বতনৌ নিখিলং মুনিঃ।
তং প্রাহু চ হরি দেবং সর্বদেবভবোদ্ভবম।।৬৪।।
মায়য়া জ্ঞানয়া কিং বা মন্ত্রশক্তয়াথ বা প্রভো
বস্ত শক্তয়াথ বা বিষ্ণো ধ্যানশক্তয়াথ বা পুনঃ।ত্যক্ত মায়ামিমাং তস্মাদ্যোদ্ধর্মহসি যত্নতঃ।।৬৫।।

এই কথা বলিয়া দধিচী মুনি নিজ শরীররর মধ্যে সমস্ত জগৎ দর্শন করিয়া সর্বদেবজনক হরিকে বললেন - হে বিষ্ণো!  এই মায়া, মন্ত্রশক্তি দ্রব্য শক্তি ও ধ্যানশক্তিতে কি হইবে? অতএবঃ মায়া ত্যাগ করে যত্নপূর্বক যুদ্ধ করুন। শ্লোকগুলোতে দধীচি মুনি  বিশ্বরূপ কে মায়ার সাথে তুলোনা করেছেন  এমনকি তিনি
নিজেও বিষ্ণুকে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন। অতঃএব বিশ্বরূপ প্রদর্শন একজন মুনির পক্ষেও সম্ভব।
.
১৪। এছাড়া ঋগ্বেদ (৪।২৬।১-৩) এ বলা হয়েছে–
.
অহং মবভৰং সূর্যশ্চাহং কক্ষীর্বা ঋষিবশি বিপ্রঃ। 
অহং কুসমার্জুনেযংন্যৃঞ্জেহেহং কবিবুশনা পশ্যতামা ।। 
অহং ভূমিমদামাৰ্যাযাহং বৃষ্টিং দাশুষে মর্ত্যাষ। 
অহং অপাে অনষং বাবশানাে মম দেবাসো অনুকেতাষান্।। 
অহং পুরাে মন্দশানো বৈব্যং নাকন্নবতীঃ শম্ভবস্য। 
শততং বেশ্যং সর্বতাতা দিবােদাসমতিথিগ্বং যদাবম্।।
.
অনুবাদ– আমি মনু (প্রজাপতি), আমি সর্ব প্রেরক সূর্য, মেধাবী কক্ষীবান্ নামক ঋষিও আমি, আজুনীপুত্র কুৎস নামক ঋষিকে আমিই প্ৰসাধিত কবি। উশনা নামক ক্ৰান্তদর্শী ( ত্রিকালজ্ঞ ) ঋষিও আমি। হে জনগণ, উত্তমরূপে সত্যদ্রষ্টা আমাকে দেখ। আমি আর্য মানবকে ভূমি দান কবেছি। হবিদানকারী মনুষ্য কে আমিই বৃষ্টিদান করি। আমিই শব্দকারী জলসমূহকে সর্বস্থানে প্রেরণ করি। দেবতারা আমার সংকল্প বহন করেন। আমিই ইন্দ্ররূপে সােমপানে মত্ত হয়ে নয়শত নিরানব্বই বার শম্বৰ নামক অসুরের পুর ধ্বংস কবেছি, দিবােদাসের প্রবেশযােগ্য করেছি শতসংখ্যক পুর।


.
বেদ-পুরাণ ঘাটলে বিশ্বরূপের এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। সুতরাং বলা যায় শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ প্রদর্শনেই প্রমাণ হয় না তিনি ঈশ্বর।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

3 comments: