বৃহদারণ্যক উপনিষদে কি মাংস ভক্ষণের কথা বলা হয়েছে?? - VedasBD.com

Breaking

Tuesday, 17 September 2019

বৃহদারণ্যক উপনিষদে কি মাংস ভক্ষণের কথা বলা হয়েছে??


বৃহদারণ্যক উপনিষদের ৬।৪।১৮ শ্লোকটি নিয়ে একটা শঙ্কা আমাদের মাঝে প্রায়শই উঠে। শঙ্কটা এরূপ যে, বিদ্বান পূত্র লাভের জন্য  স্বামী স্ত্রী উভয়ে বৃষের মাংস দ্বারা পাককৃত অন্ন আহার করবে। প্রায় সব অনুবাদক এমনটাই অনুবাদ করেছে।

অর্থাৎ ইহা দ্বারা সনাতন ধর্মে গোমাংস খাওয়ার বিধান সিদ্ধ এমনটা দাবী করে অপপ্রচারকারীরা। মূলত আমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো বেদ। বেদের জ্ঞান দ্বারাই পরবর্তিতে অনেক শাস্ত্র রচিত হয়েছে।
.
এখন আসুন বিষয়টি নিয়ে একটু  বিস্তারিত বিশ্লেষন করা যাক -
অথ য ইচ্ছেৎ পুত্রো মে পন্ডিতো বিজিগীতঃ
সমিতিঙ্গমঃ শুশ্রুষিতাং বাচ্য ভাষিতা জায়েত
সর্বাণ বেদাননুববীত সর্বমায়ুরিয়াদিতি মাষৌদনং
পাচয়িত্বা সর্পিষ্মন্তমশ্নীয়াতামীশ্বরৌ জনয়িতবা
ঔক্ষেণ বার্ষভেণ বা।। (বৃহঃ উপঃ ৬।৪।১৮)
.
শব্দার্থঃ (অথ যঃ ইচ্ছেত্ পুত্রঃ মে) এবং যে এই ইচ্ছা করে যে আমার পুত্র (পন্ডিতঃ) বিদ্বান (বিজিগীথঃ) প্রসিদ্ধ (সমিতিয় গমঃ) সভায় গমন যোগ্য (শুশ্রুষিতাম বাচম্ ভাষিতা) আদরের সহিত শ্রবণ যোগ্য ভাষনকারী (জায়েত) হবে (সর্বাণ বেদাননুববীত সর্বম্ আয়ু ইয়াত্ ইতি) সমস্ত বেদের জ্ঞাতা পূর্নায়ুর উপভোক্তা হবে তো (মাষৌদনম্) [পাঠভেদ - মাংসৌদম্] মাষের [কলাই বিশেষ] সাথে চাউল (পাচয়িত্বা সর্পিষ্মন্তম্
অশ্নীয়াতাম্ ইশ্বরী জনয়িতবৈঃ) পাক করে ঘৃতের সাথে উভয়ে [স্বামী স্ত্রী] আহার করে তো (অপেক্ষেত পুত্র) পুত্র উৎপন্ন করতে সমর্থ হবে (ঔক্ষেণ বা আর্ষভেণ) ঔক্ষ [বিধি] দ্বারা অথবা ঋষভ [বিধি] দ্বারা।
.
সরলার্থঃ এবং যে এই ইচ্ছা করে যে আমার পুত্র বিদ্বান প্রসিদ্ধ সভায় গমন যোগ্য আদরের সহিত শ্রবণ যোগ্য ভাষনকারী হবে,  সমস্ত বেদের জ্ঞাতা পূর্নায়ুর উপভোক্তা হবে তো মাষের [কলাই বিশেষ] সাথে চাউল পাক করে ঘৃতের সাথে উভয়ে [স্বামী স্ত্রী] আহার করে তো পুত্র উৎপন্ন করতে সমর্থ হবে ঔক্ষ [বিধি]
দ্বারা অথবা ঋষভ [বিধি] দ্বারা।
.
তাৎপর্যঃ এই কন্ডিকার মধ্যে বর্ণিত পুত্র প্রাপ্তির জন্য বলা হয়েছে যে, মাষের সাথে পাককৃত চাউল বিধির সাথে আহার করা উচিৎ। এই পুত্র এবং পুত্রি উৎপন্ন করার জন্য অপেক্ষিত সাধনের কাজে নেবার শিক্ষাকে সমাপ্ত করে ইহা বলা হয়েছে যে, সব প্রকারে পুত্র কে উৎপন্ন করা আদির কৃত্য ঔক্ষ এবং
আর্ষভ বিধি দ্বারা করা উচিৎ।
.
ঔক্ষ বিধিঃ ঔক্ষ শব্দ উক্ষ (সেচনে) ধাতু হতে এসেছে। উক্ষ দ্বারা উক্ষণ এবং উক্ষণের বিশেষন ঔক্ষ। ঔক্ষ বিধি বর্ণনাকারী শাস্ত্রকে ঔক্ষ শাস্ত্র বলে। কোন মিশ্রিত ঔষধি পাক আদি তৈরীতে কোন কোন ঔষধি কি কি মাত্রায় পড়া উচিৎ তাহা বর্ণনাকারী শাস্ত্রের নাম ঔক্ষ শাস্ত্র। অভিপ্রায় এই যে, উপরিউক্ত মাষের অথবা তিলৌদন আদির প্রস্তুতে এই (ঔক্ষ শাস্ত্রর) মর্যাদা কে
লক্ষ্য রেখে কাজ করা উচিৎ।
.
ঋষভ বিধিঃ ঋষভ এবং ঋষি শব্দ পর্যায়বাচক। আর্ষভের অর্থ ঋষিকৃত অথবা ঋষিদের বানানো কিছু। ঔক্ষ শাস্ত্রের সাথে এই আর্ষভ শব্দের ভাব এই যে, ঋষিদের বানানো বিধি (পদ্ধতি) র
নামই ঔক্ষ শাস্ত্র। অর্থাৎ কোন অনভিজ্ঞর বানানো বিধিকে ঔক্ষ শাস্ত্র বলা হয় না। ঋষিকৃত পদ্ধতিই ঔক্ষ শাস্ত্র।
.
মাষৌদনঃ নিরুক্তেও মাংস শব্দের অর্থের মনন, সাধক, বুদ্ধিবর্ধক মন কে রুচি দানকারী বস্তুকে বলা হয়েছে। যা ফলের রসালো অংশ, ঘী,  মাখন, ক্ষীর আদি পদার্থ (মাংস মাননং বা মানসং বা মনোস্মিনৎসীদতীতি ; নিরুক্ত ৪।১।৩)
.
শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.৭-এ এতদ্ হ বৈ পরমম্ অন্নাদ্যং য়ন্মাংসম’’বলেস্পষ্ট ভাষায় পরমান্নর (ক্ষীর) জন্য মাংসশব্দের ' ব্যবহার হয়েছে।

.
চরক সংহিতা চিকিৎসাদশম অধ্যায়ে বলা হয়েছে–

খর্জুর মাংসান্যথ নারিকেল-কোলথি মজ্জাংজন মক্ষিকা বিট এবং বৃহন্নিঘন্টতে।
 আস্রস্যানুফলে ভবন্তি যুগপন্মাংসাস্থিমজ্জাদয়ঃ, লক্ষ্যন্তে ন পৃথক-পৃথক স্ফুটতয়া, পুষ্টান্তএবস্কুটাঃ।
.
অর্থাৎ আমের শাঁসের জন্য মাংস এবং আঁটির জন্য অস্থি শব্দের প্রয়ােগ হয়। খেজুরের নরম খাওয়ার যােগ্য অংশকে ‘খর্জুর মাংস' শব্দের প্রয়ােগ দেখে তাকে পশু মাংসবাচক মনে করা অত্যন্ত ভুল।

.
‘পরমান্নং তুপায়সম অমরকোষ কা০২ শ্লোক ২৪ পায়সং পরমান্নকে-হৈমচন্দ্রঃ, পায়সস্তুক্লীবপুংসৌ, শ্রীবাস পরমান্নয়াে।। মেদিনী পরমান্ন– ক্ষীর, দুগ্ধ সহরন্ধিত চাল।

.
- সংস্কৃত শব্দার্থকৌস্তুভ পৃ০৪৭২ উক্ত প্রমাণগুলির দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ক্ষীরস্বাদযুক্ততৃপ্তি ও পরমান্নকর হওয়ায় যজ্ঞের পরিভাষায় মাংস বলে ব্যবহৃত হয়েছে।
মােনিয়র উইলিয়াস কৃত বিখ্যাত Sanskrit Dictionary, ১৭২ পৃষ্ঠায় উক্ষার অর্থ এইরকম দেওয়া আছে - 
"Wat Ukshan - Name of Soma (as sprinkling or scattering small drops) name of the maruts of the sun and Agni- one of the chief medicaments Rishabha."- Page 172.
.
জীবকর্ষভকৌ জ্ঞেয়াে, হিমাদ্রিশিখরােভবৌ। রসােনকবৎকন্দৌ, নিশ্মরৌ সূক্ষ্মপত্রকৌ।। 
.
অনুবাদ– এখানে উক্ষার অর্থ সোম, সূর্য, ঋষভক নামক ওষধি, ঋষভক ও জীবক ওষধি সম্বন্ধে বলা হয়েছে।

.
এই ঋষভক নামক ওষধির বর্ণনা অথর্ববেদ ১৯.৩৬.৫ মন্ত্রেও দেখতে পাওয়া যায় —
হিরণ্যশৃঙ্গ ঋষভঃ শাতবারাে অয়ং মণিঃ। দুর্ণামঃ সর্বাংস্কৃঢ়বা বরক্ষাংস্যক্ৰমীৎ।।
.
অনুবাদ– সুবর্ণসমান দীপ্যমান শৃঙ্গযুক্ত ঋষভমহৌষধি ত্বকের দুর্নামযুক্ত সমস্ত দুষিত রােগকে আক্রমণ করে রােগজীবাণু নাশ করে।

.

নিরুক্তেও মাংস শব্দের অর্থের মনন, সাধক, বুদ্ধিবর্ধক মন কে রুচি দানকারী বস্তুকে বলা হয়েছে। যা ফলের রসালো অংশ,  ঘী, মাখন, ক্ষীর আদি পদার্থ (মাংস মাননং বা মানসং বা মনোস্মিনৎসীদতীতি ; নিরুক্ত ৪।১।৩)
.
এখানে উক্ষা, ঋষভ ও মাংসৌদন এই তিনটি শব্দের উপর বিস্তারিত আলােচনা প্রয়ােজন। অনেক পাঠক ভ্রান্তি বশত ভাবতে পারেন যে, যারা উত্তম, বেদজ্ঞ সন্তান কামনা করে তাদেরকে মাংস ও ভাত মিশিয়ে খাওয়ার এবং বৃষের মাংসভক্ষণ করার এখানে বিধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব তথ্য অন্য। বাচষ্পত্যবৃহদভিধান এবং Sanskrit English Dictionary byApte and Monier Williams থেকে প্রমাণ উদ্ধৃত করে প্রথমেও দেখানাে হয়েছেযে, উক্ষার অর্থ সোমও এবং ঋষভের অর্থ ঋষভক নামক ঔষধিও। সুতরাং গর্ভবতী স্ত্রী ও তার পতির জন্য সােম ও ঋষভক তুল্য বীৰ্যবৰ্ষক ঔষধির সেবনের এখানে বিধান দেওয়া হয়েছে, বৃষের মাংসভক্ষণের নয়।
.
এছাড়া সুশ্রুত দ্বিতীয় অধ্যায়ে গর্ভিণীদের পক্ষে মাংসাহার অত্যন্ত ক্ষতিকর এমনকি গর্ভোপঘাতকও বলা হয়েছে যেমন - 
.
গর্ভোপঘাতকরাস্তিমেভাবাঃ -নরক্তানিবাসাংসিবিতৃয়াৎ, ন অভ্যবহরেৎ, নয়ানমধি রােহেৎ, ন মাংসশ্নীয়াৎ। 

অনুবাদ– গর্ভিণীদের জন্য মাংসাহার সম্পূর্ণ নিষেধ করে তার গণনা গর্ভোপঘাতকদের মধ্যে করা হয়েছে।
.
তাহলে কী করে এটা সম্ভব হতে পারে যে, বেদজ্ঞ, উত্তম, সাত্ত্বিক সন্তান প্রাপ্তির জন্য মাংসাহারের বিধান দেওয়া আছে। এই মন্ত্রটির পূর্ব মন্ত্রগুলিতে ক্ষীরৌদন, দধৌদন, উদৌদন, ইত্যাদির বিধান লক্ষিত হয়, অতএববিচারশীল, বিদ্বানদের মতই এখানে সুসঙ্গত মনে হয় অর্থাৎ মাংসৌদন শব্দটির শুদ্ধ পাঠ হবে মাষৌদন অর্থাৎ মাষের সঙ্গে মিশ্রিত ভাত।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

1 comment:

  1. অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে,সত্য তুলে ধরার জন্য। এই বিষয়টি পরিষ্কার অনেক দরকার ছিলো।

    ReplyDelete