সনাতন ধর্মের শাস্ত্র অনুযায়ী আমরা কি আর্য ?? - VedasBD.com

Breaking

Saturday, 14 September 2019

সনাতন ধর্মের শাস্ত্র অনুযায়ী আমরা কি আর্য ??



আমাদের জাতিগত বা সমাজগত পরিচয় আমরা কোন ক্রমেই হিন্দু নই। অতীতকালে এই ভূ-ভাগের নাম ছিল ভারতবর্ষ অথবা আর্যবর্ত। এই এলাকায় যাঁরা বসবাস করতেন তাদের বলা হতো আর্য। হিন্দু নামটি সাধারণত বিদেশীদের দেয়া নাম। ফার্সী অভীধানে এ হিন্দু নামটি গালি এবং খারাপ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আরবী ভাষাতেও হিন্দু শব্দের অর্থ ঘৃণাযুক্ত। ইংরেজ শাসন আমলে ভারতবাসীকে তারা (ইংরেজরা) ঘৃণাভরে বলতো (Native Black) নেটিভ ব্লাক। বিদেশী ভাষাসমূহের অভিধানে হিন্দু (গালি) অর্থে ব্যবহারিত হয়েছে। কেও কেও বলে সিন্ধু নদের নাম উচ্চারনের পরিবর্তন হয়ে হিন্দু শব্দ হয়েছে; মূলত এটি একদমই ঠিক নয়। ঐতিহাসিকেরা এবং ভাষাতাত্বিকেরা গবেষণা করে প্রমাণ করেছে হিন্দু নামটি বিদেশী শাষকদের চাপিয়ে দেওয়া নাম। কালে কালে এই ভূ-ভাগে নির্যাতিত জনসাধারণেরা বিদেশী শাসকদের পদাণত হওয়ার জন্য হিন্দু নামটি বিস্তার লাভ করে এবং ক্রমানয়ে জনসাধারনেরা হিন্দু নামটি স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সনাতন ধর্মে প্রমাণ্য ধর্ম পুস্তক সমূহ প্রমাণ দেয় আমাদের ধর্ম সনাতন ধর্ম বা বৈদিক ধর্ম এবং আমাদের পরিচয় আর্যাবর্ত বা আর্য জাতি। ১৮৩০ সালে ভারতীয় সংবিধানে ইংরেজ সরকার হিন্দু নামটি পাকাপুক্ত ভাবে সংবিধানে জুড়ে দেন। আমরা কোন ক্রমেই হিন্দু নই,এটি বিদেশীদের দেয়া নাম মাত্র।
.
এছাড়া আমরা যে আর্য জাতির বংশধর এবং আর্য, সেই বিষয়ে বিভিন্ন প্রমাণ্য শাস্ত্রের ব্যাখার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। যাস্কাচার্য 'আর্য' শব্দের নিরুক্তিগত অর্থ করেছেন, আর্য- অর্থাৎ “ঈশ্বর পুত্র”। এর অভিপ্রায় এই যে, ঈশ্বরের যথার্থ পুত্রকে ‘আর্য’ নামে সম্বোধন করা হয়।
.
পিতার অনেক পুত্র থাকা সত্বেও পিতার অনুবর্তী, আজ্ঞা পালনকারী, সদাচারী, আদর্শ পুত্রকেই বাস্তবিক পক্ষে পুত্র বলা হয়ে থাকে। সেইরূপ যদ্যপি মানব মাত্রই ঈশ্বরের পুত্র তথাপি আর্য অর্থাৎ সদাচারী পরায়ণ পুরুষকেই ঈশ্বর পুত্র নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
.
প্রাচীন গ্রন্থে ‘আর্য’ শব্দ- বেদেই রয়েছে
(১)আর্য্য ব্রতা বিসৃজন্তো আধি ক্ষমি।” (ঋগ্বেদ ১০।৬৫।১১)
(২) কৃন্বস্তো বিশ্বমার্যম (ঋগ্বেদ ৯।৬৩।৫)
(৩)"বিজানহ্যির্যান্ বিশ্বমার্যম্।" (ঋগ্বেদ ৯।৬৩।৫)
(৪) "বিজানীহ্যর্য্যান্যেচ দস্যবো বহিস্মতে রন্ধায় শাসদব্রতান্।" (ঋগ্বেদ ১।৫১।৮) 

.
উক্ত, মন্ত্র সমূহে সত্য, অহিংস, পবিত্রতাদি উত্তম ব্রতধারী ব্যক্তিদের 'আর্য' বলা হয়েছে এবং বিশ্বের নর-নারী সকলকে এইরূপ 'আর্য' করার উপদেশ দেয়া হয়েছে।
.
(৫) "আর্যবৃত্ত" (গৌতম ধর্ম সূত্র ১৯।৯৬) সদাচার পরায়ণ অর্থে 'আর্য' শব্দ প্রযুক্ত হয়।
.
(৬) বাল্মিকী রামায়ণ-  "সর্বদাভিগতঃ সদ্ভিঃ সমুদ্র ইব সিন্ধুভিঃ। 
আর্যসর্বসমশ্বৈব সদৈব প্রিয়দর্শন"।। (বাঃ রাঃ ১।১।১৬) 

অনুবাদ - রামচন্দ্র সদাসর্বদা সৎপুরুষদের সাহচর্যে 'আর্য' ভাবে থাকতেন যেরূপ সমুদ্র সদা নদী সমূহের সাথে মিলে থাকতেন, তথা তিনি আর্য সমদর্শী এবং সকলের প্রিয় ছিলেন।
.
(৭) বিদুরনীতি- "আর্য কর্মাণি রজ্যন্ত ভূতি কর্মাণি কুর্বতে হিতং চ নাভ্যসূযন্তি পন্ডিতা ভরতবর্ষ।।
দত্ত্বা ন পশ্চাৎ কুরুতেহনুতাপং স কথ্যতে সৎপুরুষার্য শীলঃ।। (বিঃনীঃ ১।৩০, ১।১১৮) 
.
এই বচন সমূহে অত্যন্ত ধার্মিককে 'আর্য' বলা হয়েছে।
.
(৮) চাণক্য নীতি- "অভ্যাসাদ্ ধার্যতে বিদ্যা কুলং শীলেন ধার্যতে। গুণেন জ্ঞাযতে আর্যঃ কোপো নেত্রেণ গম্যাতে"।। (চাঃনীঃ ৫।৮)
. 
এখানে গুণী জনকে আর্য বলা হয়েছে।
.
(৯) মহাভারত- "স বাল এবার্যমতির্নৃ পোত্তমঃ"। (মঃভাঃ আদিপর্বে ৪০।৭) 
.
এই বচনে উত্তম রাজকুমারের সাথে 'আর্যমতি' বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছে, এর অর্থ শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান।
.
(১০) কৌটিল্য-অর্থশাস্ত্র-বাবস্থিতাৰ্যমর্যাদঃ, কৃতবর্ণাশ্রমস্থিতঃ।”

যে আর্যগণের মর্যাদাকে ব্যবস্থিত করতে সমর্থ সেই রাজ্যাধিকারী, এরূপ বর্ণিত হয়েছে।
.
(১১) গীতা- " কুতাস্ত্ব কাশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্। অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন"।।(শ্রীমদ্ভগবদ গীতা ২।২)
.
 এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বুঝিয়েছে- যারা অধর্মের পথে কুরক্ষেত্রের লিপ্ত হয়েছে তাহারা অনার্য। তাদের প্রতি কেন অনার্য সেবিত মোহ জন্মিল। এই মোহ সৎ (আর্য) ব্যক্তির শোভা পায় না। (এখানে স্পষ্ট শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন আর্য)
.
(১২) আর্য- "অর্তুং প্রকৃতমাচরিতুংযোগ্যঃ যোগ্যঃ"।
.
অর্থাৎ- শাস্ত্রোক্ত উত্তম মার্গে বিচরণকারী পূজ্যঃ শ্রেষ্ট। শব্দ রত্নাবলী নামক সংস্কৃত কোষে আর্য শব্দের অর্থ পূর্জ্য এবং শ্রেষ্ট বলা হয়েছে। "সঙ্গতে ইত্যজয়ঃ" অজয় নামক অভিধান কর্তা 'আর্য'' শব্দের অর্থ 'সঙ্গত' বলেছেন। অর্থাৎ যারা সিদ্ধান্ত এবং ব্যবহার বুদ্ধি সঙ্গত, যারা বিশ্বাস এবং আচরণে পরস্পর বিরোধ দৃষ্ট হয় না তাদেরকে আর্য বলা হয়েছে
.
এখন প্রশ্ন তাহলে আর্য ও দস্যু কাদেরকে বলা হয় -

বেদ উপদেশ দান করে-মানব, তুমি আর্য এবং দস্যুর পরিজ্ঞান লাভ কর। যে সমাজ এই পরিজ্ঞানে যত পারদর্শী হবে, সে ততই সুখী এবং যে যতই অপারদর্শী সে ততই দুঃখী হবে। বেদ বর্ণিত সার্বভৌম নিয়ম সর্বত্র সমান রূপে থাকে। এই নিয়মের সহায়তা লাভ করে মনুষ্য সমাজ, জাতি অথবা দেশকে উন্নত করে এবং এ হতে বিমুখ হয়ে অবনত হতে দেখা গিয়েছে। আর্যদের বীজ প্রত্যেক মানব অন্তরে সমান রূপে থাকে। এই বীজ অনুকুল অবস্থা লাভ করে মনুষ্যকে আর্যত্বের প্রতি এবং প্রতিকুল অবস্থায় অনার্যত্বের প্রতি লয়ে যায়। ব্ৰতানুকুল আচরণকারীকে ‘আর্য' এবং ব্রতানুকুল আচরণ পরিত্যাগকারীকে দস্যু' বলা হয়। সত্য ভাষণ প্রভৃতি আত্মার উত্তম গুণ। এই গুণসমূহ পালন করাকে ‘ব্রত এবং পালন না করাকে অব্ৰত' বলা হয়। অতএব মানব মাত্রের উচিত শুভ ব্রত পালন করা এবং প্রত্যেক প্রকার কষ্ট এবং ত্যাগের মুখােমুখি হয়ে। ব্রত পালনে অটল থাকা। তা হলে “আর্য” সংজ্ঞা লাভ করা যায়।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

No comments:

Post a Comment