শ্রী রামচন্দ্র কি আমিষভোজী ছিলেন - VedasBD.com

Breaking

Saturday, 31 August 2019

শ্রী রামচন্দ্র কি আমিষভোজী ছিলেন


শ্রীরামচন্দ্র পূর্ণরূপে নিরামিষভোজী ছিলেন। কারন আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হলো স্বয়ং বেদ। বেদে অনেক স্থানে মানুষকে নিরামিষভোজী  হওয়ার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছে এবং মাংস ভক্ষণ কারীদেরকে নিন্দা করা হয়েছে। নিরীহ পশুকে রক্ষা করা আর্যগণ দের কর্তব্য বলা হয়েছে। এবং যেসব মানুষ নিরীহ পশুর উপর অত্যাচার করে তাদেরকে কঠোর দন্ড দেবার আজ্ঞা বেদ দিয়েছেন। বেদে গাভীকে "অঘ্না"  "অদিতি" ইত্যাদি শব্দে ভূষিত করা হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে গাভীগুলো হত্যার অযোগ্য। এছাড়া বেদে সম্পূর্ণভাবে গো ভক্ষণ এবং গো হত্যা নিষেধ এবং গো হত্যাকারীকে শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে। যেমন-
.
প্র নু বোচং চিকিতুষে জনায় মা গামনাগা মদিতিং বধিষ্ট।।
(ঋগবেদ ৮।১০১।১৫)
--- হে জ্ঞানবান পুরুষের নিকট আমি বলেতেছি  নিরপরাধ  অহিংস পৃথিবী সদৃশ গাভীকে হত্যা করিও না।
.
যদি নো গাং হংসি যদ্যশ্বং যদি পুরুষম।তং ত্বা সীসেন বিধ্যামো যথা নোহসো অবীরহা।।
(অথর্বেদ ১।১৬।৪)
--- যদি আমাদের গাভীকে হিংসা কর যদি অশ্বকে  যদি মনুষ্যকে হিংসা কর তবে তোমাকে সীসক দ্বারা বিদ্ধ করিব  যাহাতে আমাদের মধ্যে বীরদের বিনাশক কেহ না থাকে।
.
"অনাগো হত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে মা নো গাম অশ্বম পুরুষং বধী"
(অথর্ববেদ ১০।১।২৯)
--- নির্দোষের হত্যা অবশ্যই ভয়ানক। আমাদের গাভী, অশ্ব, পুরুষকে মেরো না।
.
"গোঘাতম্ ক্ষেধে যঃ গাম্ বিকৃন্তন্তম"
(যজুর্বেদ ৩০।১৮)
- গাভীর ঘাতক অর্থাৎ হত্যাকারী যে, ক্ষুধার জন্য গাভীকে হত্যা করে। তাকে ছেদন করি।
.
" অদিতিম মা হিংসী"
(যজুর্বেদ ১৩। ৪৯)
- হত্যার অযোগ্য গাভীকে কখনো মেরো না।
.
" মা গাম অনাগাম অদিতিম বধিষ্ট"
(ঋগবেদ ৮।১০১।১৫)
--- নিরপরাধ গাভী এবং ভূমিতূল্য গাভীকে কখনো বধ করো না।
.
--- "অঘ্না ইব" গাভী সমূহ বধের অযোগ্য। সর্বদা ( পশুন ত্রায়েথাম, যজুঃ ৬।১১) পশুদের রক্ষা করো তাদের পালন করো (অঃ ৩।৩০।১)।
.
যঃ পৌরষেযেণ ক্রবিষাং সমঙ্কতে যো অশ্বয়েন পশুনাং যতুধান। যো অঘ্ন্যায় ভরতি ক্ষীরমগ্নে তেষাং শীর্ষাণি হরসাপি বৃশ্চ।। (অথর্ববেদ ৮।৩।১৫)
- যে দুঃখদায়ী জীব পুরুষ বধ দ্বারা প্রাপ্ত মাংস দ্বারা যে ঘোড়ার মাংস এবং পশু দ্বারা নিজেকে পুষ্ট করে এবং যে হত্যার অযোগ্য গাভীর দুধকে নষ্ট করে হে অগ্নি তাহার শির কে নিজের বল দ্বারা ছিন্ন করো।
.
ইমং মা হিংসীরেকশফং পশুং কনিকদং বাজিনং বাজিনেষু।।
(যজুর্বেদ ১৩।৪৮)
- হে পুরুষ এই হর্ষ ধ্বনিকারক এক ক্ষুর বিশিষ্ট বেগবান অশ্বকে মেরো না।
.
 একশফো বা এষ পশুর্যদশ্চ; তং মা হিংসীরিতি"
(শতপথঃ ৭।৫।২।৩৩)
- ইহার অভিপ্রায় এই যে, একশফ শব্দ দ্বারা অশ্বের গ্রহন হয়ে থাকে। এইজন্য একশফ পশু অশ্বকে তুমি হিংসা করো না।
.
যে অর্বন্ত জিঘাংসতি তমজ্যসীতি বরুণঃ পরো মর্তঃ পরঃশ্ব।।
(যজুর্বেদ ২২।৫)
-যে মনুষ্য অশ্বকে হত্যার ইচ্ছা করে হে বরুণ তাকে শাস্তি প্রদান করো।
.
 রাজসূয়ং বাজপেয়মগ্নিষ্টোমস্ত­দধ্বরঃ।
অর্কাশ্বমেধাবুচ্ছিষ্­ট জীবর্বহিভমদিন্তম।।
(অথর্ববেদ ১১।৭।৭)
- রাজসূয়, বাজপেয়, অগ্নিষ্টোম এইসব যজ্ঞ অধ্বর অর্থাৎ হিংসারহিত। অর্ক এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ প্রভূর মধ্যে স্থিত, যাহা জীবের বৃদ্ধিকারী এবং অতন্ত্য হর্ষদায়ক।
.
শ্রীরামচন্দ্র জীর দিন কাল অনুসারে পূর্ব ২৫০০ বর্ষ এর মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঈশ্বরীয় বৈদিক ধর্মের লোপ এবং মানব নির্মিত মত মতান্তরের প্রচারই বেশী হয়েছে। যাহার মধ্যে বেদ বিরুদ্ধ মান্যতাই সর্বাধিক ছিল। ঠিক এরকমই এক মত ছিলো বামমার্গ। যাদের মান্যতা ছিলো মাংস, মদ,মৎস আদি দ্বারা ঈশ্বর প্রাপ্তির বিধান। বামমার্গের সমর্থকরা যখন এটা দেখলো যে জনসমাজের সবচেয়ে বড় আদর্শ শ্রীরামচন্দ্র। এইজন্য যতক্ষন তার মধ্যে অবৈদিক মান্যতা না পাওয়া যায় ততক্ষন আমাদের প্রভাব বিস্তার সম্ভব নয়। এজন্য তারা শ্রীরামচন্দ্র জীর সবচেয়ে প্রামাণিক জীবন চরিত্র বাল্মিকী রামায়ন বেছে নিলো। এবং যথানুসারে তাদের মত লিপিবদ্ধ করতে আরম্ভ করলো যার পরিণাম আজ আপনাদের সামনে।
.
 বাল্মীকি রামায়নের প্রক্ষীপ্ত শ্লোক সম্পর্কে ধারনা -
এই সময় দেশ মধ্যে বাল্মীকি রামায়নের যে পান্ডুলিপি পাওয়া যায় তার দুই খন্ড রয়েছে। এক বঙ্গ দেশ মধ্যে মিলেছে যার মধ্যে বাল, অযোধ্যা,অরণ্য, কিষ্কিন্ধা, সুন্দর এবং যুদ্ধ ৬কান্ড রয়েছে। এবং মোট সর্গ ৫৫৭ এবং শ্লোক সংখ্যা ১৯৭৯৩। এবং দ্বিতীয় খন্ড বোম্বাই এ মিলেছে যার মধ্যে উক্ত ৬কান্ড ছাড়াও আরো একটি উত্তর কান্ড রয়েছে। মোট সর্গ ৬৫০ এবং শ্লোকসংখ্যা
২২৪৫২৮ টি। দুই খন্ডের পাঠ ভেদ হওয়ার কারনে উত্তর কান্ড সম্পূর্ণ ভাবে প্রক্ষীপ্ত।।
.
প্রক্ষীপ্ত শ্লোক এই প্রকার যে বেদের শিক্ষার প্রতিকুল- যেহেতু বেদের মধ্যে মাংস খাওয়ার মান্যতা নেই সেহেতু বাল্মীকি রামায়নে কোন অপপ্রচার মূলক শ্লোক মাংস ভক্ষনের সমর্থন করে থাকলেও তাহা প্রক্ষীপ্ত হিসেবেই গণ্য হইবে। শ্রীরামচন্দ্রের সময়ে বামমার্গ আদি কোন প্রচলন ছিলো না। এইজন্য বামমার্গের যেসব মান্যতা বাল্মীকি রামায়নের মধ্যে রয়েছে তা প্রক্ষীপ্ত। এককথায় বলা চলে ঈশ্বরের সৃষ্টি নিয়মের বিরুদ্ধ যে মান্যতা রয়েছে তাহাই প্রক্ষীপ্ত। যেমন হনুমান জীকে বানর মতো মনে করা যা আদৌ সম্ভব নয়। কারন পশুরা কখনো মানুষের মতো কথা বলতে পারে না। হনুমান জী বেদজ্ঞ বিদ্বান এবং পরম বলশালী ছিলেন। এছাড়াও আরো রয়েছে মাতা সীতার অগ্নি পরীক্ষা আদি অসম্ভব ঘটনা।  শ্রীরামচন্দ্র জীর যুদ্ধ বিজয় উল্লাস তথা ১৪ বছর বনবাসের পর অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন  এবং অযোধ্যা বাসীর আনন্দ উল্লাস। সেখানে এই প্রকার অগ্নি পরীক্ষা অনাবশ্যক বর্ণনা মাত্র।
.
 রামায়নে মাংসাহারের বিরুদ্ধে ঋষি বিশ্বামিত্র স্বয়ং সাক্ষী-
রামায়ন বাল কান্ডের মধ্যে ঋষি বিশ্বামিত্র রাজা দশরথের সমক্ষ এসে তার সমস্যার কথা বললেন যে , যখন তিনি যজ্ঞ করতে বসেন তখন সবাহু এবং মারীচ নামে দুই রাক্ষস  মাংস, রক্ত আদি অপবিত্র পদার্থ দ্বারা যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটায় এবং যজ্ঞকে অপবিত্র করে। এজন্য বিশ্বামিত্র তার যজ্ঞ রক্ষার জন্য সাহায্য চাইলেন। তখন রাজা দশরথ শ্রীরামচন্দ্র এবং লক্ষণ জী কে যজ্ঞ
রক্ষার্থে পাঠালেন। যার পরিণাম স্বরূপ যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় এবং সেই সাথে রাক্ষস সংহার হয়।
.
যে লোক যজ্ঞ আদির মধ্যে পশু বলি বিধানের সমর্থন করেন। বাল্মীকি রামায়নের মধ্যে রাজা দশরথ কৃত অশ্বমেধ আদি যজ্ঞের মধ্যে পশু বলি মানেন। তো তাদের নিকট প্রশ্ন যদি যজ্ঞের মধ্যে পশু বলির বিধান থাকে তো ঋষি বিশ্বামিত্র কেন বললেন রাক্ষস আমার যজ্ঞ মাংস,রক্ত দিয়ে অপবিত্র করছে। আমার সহায়তা করুন। ইহাতে সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট যে, রামায়নের মধ্যে পশু বলির বর্ণনা প্রক্ষীপ্ত। এছাড়া প্রাচীন ভারতের মধ্যে নাকি অতিথী সৎকার মাংস দ্বারা করা হতো। এই দাবীর সত্যতা এবং খন্ডন স্বয়ং বাল্মীকি রামায়ন মধ্যে রয়েছে। যখন ঋষি বিশ্বামিত্র ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রম মধ্যে পদাচারন করেন। তখন ঋষি বশিষ্ঠ ঋষি বিশ্বামিত্রকে মাংস দ্বার নয় বরং মিষ্টান্ন পদার্থ ক্ষীর দধি সৎকার করেছিলেন। (বাল কান্ড সর্গ ৫২ শ্লোক ১-৬) শ্রীরামচন্দ্র জীর মাংসাহারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ঘোষনা অযোধ্যা কান্ড সর্গ ২০শ্লোক ২৯ মধ্যে রয়েছে। যখন শ্রীরাম জী বনেরমধ্যে যাবার জন্য প্রস্তুত তখন মাতা কৌশল্যাকে রাম জী বললেন যে-
.
চতুর্দষ হি বর্ষাণি বৎস্যামি বিজনে বনে।
কন্তমূলফলৈজীবনে হিত্বা মুনিবদমিষম্।। ২৯

অনুবাদ- আমি চতুর্দশ বর্ষ পর্যন্ত বষ্কল পরিধান করিয়া ফল মূল ভক্ষন ও জীবন ধারন করিবার জন্য বনে বাস করিবো।।
.
এর থেকে মাংস বিরুদ্ধ সাক্ষী আর কি হতে পারে ? শ্রীরাম জী দ্বারা সীতা মাতার কথা অনুসারে স্বর্ণ হরিণ শিকার এক শঙ্কা। যেখানে রাম জী না কি স্বর্ণ হরিন শিকার করেছে তার মাংস খাবার জন্য। এই শঙ্কার সমাধান রামায়ন অরণ্য কান্ডের মধ্যে রয়েছে মাতা সীতা শ্রী রামচন্দ্র জী কে স্বর্ণ হরিণ ধরার জন্য এইরূপ বলেছিলেন যে-→↓↓
.
শ্রীরামচন্দ্র যদি স্বর্ণ হরিণ জীবিত ধরতে পারেন তো আশ্চার্যপ্রদ রূপে আশ্রমে বিচরন করে বিষ্ময় করবে। (অরণ্য কান্ড সর্গ ৪৩ শ্লোক ১৫)।। আর যদি মারা যায় তবে তার সোনালী চামড়া চাটাইয়ের উপরে বিছিয়ে উপবেশন করা যাবে।(অরণ্য কান্ড সর্গ ৪৩ শ্লোক ১৯) ইহা দ্বারা নিশ্চিতরূপে সিদ্ধ হয় যে, স্বর্ণ হরিণ
শিকার মাংস খাওয়ার জন্য করা হয় নি।
.
 শ্রীরামচন্দ্র আসলে খাদ্য হিসেবে কি গ্রহন করতেন? বাল্মীকি রামায়নের সুন্দরকান্ড, স্কন্দ ৩৬ এর ৪১ নং শ্লোকে শ্রীরামচন্দ্রের খাদ্যবিধি বর্ননা করা হয়েছে এভাবে-
.
ন মাংসম রাঘব ভুংক্তে। ন চৈব মধু সেবতে।
 বন্যম সুবিহিতম নিত্যম ভক্তমস্নতি পঞ্চমম।।
.
অনুবাদ- শ্রীরাম কখনোই মাংস ভক্ষণ করেননি এবং কোনরকম মধুও খেতেন না। তিনি প্রতিদিন ফল এবং স্বিদ্ধ ভাত খেতেন যা একজন ব্রহ্মচারীর জন্য অনুমোদিত।
.
কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের প্রথম অধ্যয়ে শ্রীরামের বনবাস যাত্রাকালে পথিমধ্যে রাজা কবন্ধের সাথে দেখা হলে কোনদিকে গেলে তিনি তার জীবনধারনের জন্য তিনি যে নিরামিষ আহার করেন তা পাওয়া সুবিধাজনক হবে জানতে চাইলে কবন্ধ তাঁকে বলেন-
.
"হে শ্রীরাম,তুমি এখান থেকে পশ্চিমদিকে যাও,সেখানে তোমার প্রয়োজনীয় ফল আম,কাঠাল,কলাসহ অন্যান্য ফলগুলো এবং নাগ,ধন্ব,তিলক,নক্তমালাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সবজিগুলো পাবে।"
.
বনবাসের জন্য অযোধ্যা ত্যগকালে মাতা কৌশল্যার প্রতি শ্রীরামচন্দ্রের প্রতিশ্রুতি-
.
ফলমুলাসন নিত্যম ভবিষ্যামি নসংশয়।
ন তু দুখং কৈশ্যামি নিবসন্তি ত্বয় সদা।।
(অযোধ্যা কান্ড ২.২৭.১৬)
.
অনুবাদ -" মা তোমাকে আমি কথা দিচ্ছি আমি ফলমূলাদি ছাড়া কখনো মাংসাদি গ্রহন করবনা। তোমাকে ছেড়ে থাকলেও আমি কখনো এরুপ বিপথগামী হবনা।"
.
এছাড়া বীর হনুমান যখন অনেক বাধা অতিক্রম করে অশোক বাটিকার মধ্যে পৌছে তখন সীতা মাতা রাম জীর কুশল জীজ্ঞাসা করেন। অর্থাৎ তিনি কি শোকে ব্যাকুল হয়ে অবৈদিক পথে চলছে?তখন হনুমান জী বলেন-
.
ন মাংস রাঘবো ভূঙ্ক্তে ন চাপি মধুসেবতে।
অনুবাদ- রাম জী না মাংস খান, না মদ্য পান করেন।
(সুন্দর কান্ড ৩৬।৪১)।।
.
বাল্মিকী রামায়ন সুন্দর কান্ড ৩৬।৪১ সীতা মাতার এই জিজ্ঞাসা এটাই স্পষ্ট করে যে, যদি রামচন্দ্র জী মাংস ভক্ষন করে থাকতো তবে সীতা মাতার এই রূপ জিজ্ঞাসার কোন আবশ্যকতা থাকতো না। অতএব বাল্মিকী রামায়নে মাংস ভক্ষনের যেসব মিথ্যা অপপ্রচার মূলক শ্লোক রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে প্রক্ষীপ্ত।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ


1 comment: