বেদে নারীর অধিকার ও মিথ্যা অপপ্রচারের জবাব - VedasBD.com

Breaking

Friday, 2 August 2019

বেদে নারীর অধিকার ও মিথ্যা অপপ্রচারের জবাব


বর্তমানে নারী বিষয় নিয়ে যেন ভ্রান্তির আর শেষ নেই।  কিছু কুচক্রী বেদের উপর দোষারোপ করে বলে যে, বেদের কারনেই নারী জাতির সতিদাহ প্রথা, বাল্য বিবাহ, দেবদাসী প্রথা,অশিক্ষা এবং সমাজের মধ্যে নিচু স্খান প্রাপ্ত হয়েছে। যা নারী জাতিকে নিশ্চিতরূপে অবমাননা করার চিত্র স্বরূপ। কিন্তু বেদ এগুলোর কোনটারই সমর্থন করে নি।  পরন্তু নারীকে এতটাই উচ্চ স্থান প্রদান করেছে যে, বিশ্বের কোন ধর্ম শাস্ত্রে এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় না।

.
তবুও কিছু কুচক্রিরা এই কুতর্ক দেওয়া প্রারম্ভ করেছে যে, বেদ নারীকে হীন দৃষ্টিতে দেখেছে এবং সর্বত্র পূত্রকে কামনা করার কথা বলেছে, নারীকে করেছে অপেক্ষা। কিন্তু সত্য এই যে, বেদ মধ্যে নারীকে উষার সমান প্রকাশ, বীরাঙ্গনা, পতিব্রকা,অন্নপূর্ণা, সদগৃহিনী, সাম্রাজ্ঞী ইত্যাদি মর্যাদায় ভূষিত করেছে। যা নিশ্চিত রূপে নারীর প্রতি উচিত সম্মানসূচক শব্দ।  উদাহরনের জন্য বেদ মন্ত্রে নারী জাতীর সম্মানসূচক কিছু নমুনা নিম্নে দেখানো হলো-
.
(অথর্ববেদ১৪।২।৭১)
---হে স্বামিন! আমি যেরূপ জ্ঞানী, তুমিও সেইরূপ জ্ঞানী, আমি সামমন্ত্র তুমি ঋকমন্ত্র, আমি দুল্যোক তুমি পৃথিবীলোক।
.
(অথর্ববেদ ১৪।২।২৬)
---হে বধু! শশুড়ের প্রতি, পতির প্রতি, গৃহের প্রতি এবং এই সব প্রজাদের প্রতি সুখদায়িনী হও, ইহাদের পুষ্টির জন্য মঙ্গল দায়িনী হও।
.
(অথর্ববেদ ১৪।২।২৭)
--- হে বধু! কল্যাণময়ী, গৃহের শোভাবর্দ্ধনকারী, পতি সেবা পরায়ন, শশুরের শক্তিদায়িনী, শাশুড়ীর আনন্দ দায়িনী, গৃহকার্যে নিপুনা হও।
.
(অথর্ববেদ ১৪।১।৪০)
--- হে বধু! যেমন বলবান সমুদ্র নদী সমূহের উপর সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছে, তুমিও তেমন পতিগৃহে গিয়ে সাম্রাজ্ঞী হইয়া থাকো।
.
(অথর্ববেদ১৪।১।৪৪)
--- শবশুরদের মধ্যে এবং দেবরদের মধ্যে, ননদ ও শাশুড়ীর সঙ্গে মিলিয়া সম্রাজ্ঞী হইয়া থাকো।
.
(অথর্ববেদ ১৪।২।২৮)
--- এই বধু মঙ্গলময়ী, সকলে মিলিয়া ইহাকে দেখো, ইহাকে সৌভাগ্য দান করিয়া দূর্ভাগ্য বিদারিত করো।
.
(অথর্ববেদ১০।৮৫।৪৬)
--- হে স্ত্রী! শশুরের নিকট সম্রাজ্ঞী হও, শাশুড়ীর নিকট সম্রাজ্ঞী হও, ননদের নিকট সম্রাজ্ঞী হও এবং দেবরদের নিকট সাম্রাজ্ঞীর অধিকার প্রাপ্ত হও।
.
(অথর্ববেদ ৩।১২।৮)
--- হে স্ত্রী! অমৃতরসে পরিপূর্ণ এই কুম্ভকে আরো পূর্ণ করিয়া আনো, অমৃতপূর্ণ ঘৃতধারাকে আনো, পিপাসুকে অমৃতরসে তৃপ্ত করো। ইষ্ট কামনার পূর্তি গৃহকে রক্ষা করিবে।
.
আরো কিছু মন্ত্র আমরা দেখবো যেগুলোতে পূত্রের পাশাপাশি কণ্যাকেও প্রার্থনা করা হয়েছে -
(ঋগবেদ ১০।১৫৯।৩)
---- আমার পূত্র শত্রুর নাশকারী এবং নিশ্চয়রূপে আমার কণ্যা বিশিষ্টরূপে তেজস্বীনী।
.
(ঋগবেদ ৯।৬৭।১০)
---- যেমন যশ এই কণ্যার মধ্যে এবং যেমন যশ সম্যকভৃত রথের মধ্যে ঐরূপ যশ আমার প্রাপ্ত হোক।

অর্থাৎ বেদে যদি কোন কণ্যা সন্তান কে  চাওয়াই হয় নি। তবে এই সুক্তে কণ্যাকে বিবাহ দেওয়ার কথা কেন বলা হচ্ছে? এখানে পিতা তার কণ্যাকে অতন্ত ভালোবাসার সহিত বর কে দান করছে।  অতএব ইহাও স্পষ্ট যে এখানে কণ্যা তার পিতার নিকট অত্যন্ত আদরণীয় ছিলো। কিন্তু এসব মন্ত্রগুলো সেই সব কুচক্রীদের চক্ষু দেখিতে ব্যর্থ। এ জন্যই তারা বেদ হতে কিছু ভ্রান্ত দাবী উল্লেখ করে বেদ কলুষিত করতে চায়।  এ পর্যায়ে আমরা সেই সব দাবীগুলোর পর্যালোচনা এবং উচিত জবাব প্রদান করার প্রচেষ্টা করবো - 
.
=>> অপপ্রচারকারী দাবী 
যযুরবেদ ৮।৫ এ বলা হয়েছে "যে ঘরে স্বামী স্ত্রী নীতি ও আদর্শের সাথে ঘর করে, তাহারা ধন সম্পত্তি, উন্নতি ও মহৎ নৈতিকগুনযুক্ত পুত্রের আশিব্বাদপুস্ট"
উল্লিখিত মন্ত্রে মেয়ে শিশুর কোন স্থানই নেই। মেয়েরা কি মহৎ ও নৈতিক গুনযুক্ত হতে পারে না ? তাহারা কি সংসারে উন্নতি আনতে পারে না ? তাহলে জন্মের জন্য আশীর্বাদ কেন শুধু ছেলেদের করা হল ? ঈশ্বর কেন এক চোখা নীতি অবলম্বন করল ?
একি ভাবে মেয়ে সন্তানকে বাদ দিয়ে শুধু ছেলে সন্তান জন্মানোর আশির্বাদ দিচ্ছে রিগবেদ ৮।১৯।৩৬ এ,
একি আশির্বাদ ঈশ্বর আবার দিলেন যজুর্বেদ ২২।২২ এ।
.
জবাবঃ
অবশ্যই মেয়েরা সংসারের উন্নতির সাথে মহৎ এবং নৈতিক  গুনযুক্ত হতে পারে। বেদে নারীকে স্পষ্টভাবে তেজস্বীনী, যশস্বীনী, মঙ্গলদায়ীনী,সাম্রাজ্ঞী, গৃহের প্রতি সুখদায়িনি ইত্যাদি মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে।  যা উপবে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কেউ বেদের মধ্য থেকে পূত্র প্রসংশাকৃত  গোটা কয়েক  মন্ত্র উল্লেখ করে বলে যে , বেদে নারীদের কোন সম্মানই দেওয়া হয় নি। তবে তার দোষটা হচ্ছে বাজারে সব্জি বিক্রেতার কাছে স্বর্ণের খোজ করার মতো। বেদের মতো বিশাল জ্ঞান ভান্ডার কে দুই একটা মন্ত্র দ্বারা বিচার করা মূর্খামী ছাড়া কিছুই নয়। যেমন  যজুর্বেদ ৮।৫ এ পুত্র সন্তানের প্রশংসা করা হয়েছে। তার মানে কি বেদ নারী কে অসম্মান করেছে। ধরুন আমি apple খাবো এর মানে কি আমি orange কে ঘৃণা করি?  মন্ত্রটিতে পুত্র সন্তানের প্রয়োজনিতা দয়ানন্দ জী ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে-  বৃদ্ধাবস্থায় সে পুত্র যেন তাদের দুঃখের রক্ষাকারী হয়। কারন পিতামাতার  অন্তিম সময় পুত্রই তাদের ভরণ পোষন করে। আর  কণ্যা তখন শশুড়ালয়ে থাকে। তবে যদি এ মন্ত্রে পুত্রের প্রর্থনা করা হয় তবে কি সেটা নারীদের প্রতি অসম্মান হবে?


মন্ত্রটির সরলার্থ নিম্মরূপ - 

হে বিবিধ প্রকারের স্থান মধ্যে অবস্থান কারী অবিনাশীস্বরূপ বিদ্বান গৃহস্থ!  এই যে  তোমরা যেরূপ সোমলতা আদি ঔষধের পান করতে আসো,  ঐরূপ গৃহাশ্রম। তার  মধ্যে তোমরা সব দিন আনন্দিত থাকো। হে গৃহাশ্রমকারী গৃহস্থ  তোমরা এই গৃহাশ্রমের বাগ ব্যবহারের জন্য সত্যেরই  ধারন করো।  যেই গৃহাশ্রমের মধ্যে স্ত্রী পুরুষ প্রসংশনীয় গৃহাশ্রমের ধর্ম কে প্রাপ্ত হয়,তার মধ্যে কামনা দান কারী নিষ্পাপ ধর্মাত্মা  পুরুষার্থ বৃদ্ধাবস্থায় দুঃখ থেকে রক্ষাকারী পূত্র  উৎপন্ন হয়। এই উত্তম  ধন কে  প্রাপ্ত হয়,  এর অনন্তর এই কুটুম্ব এবং বিদ্যা ধনের ঐশ্বর্য দ্বারা  বৃদ্ধি হয়।
(অনুবাদঃ দয়ানন্দ সরস্বতী)
.
এইরূপ যজুর্বেদ ২২।২২ মন্ত্রে পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যে, আমাদের রাজ্যে যেন বিদ্বান ব্রাহ্মন, নির্ভয় ক্ষত্রিয়, দুগ্ধপূর্ণ গাভী, ভারবাহী ষাড়,  ঔষধি,   সুন্দর ব্যবহার কারী স্ত্রী এবং শত্রু বিজয়কারী পুরুষ উৎপন্ন হয়। মন্ত্রটিতে স্পষ্টভাবে পুরুষের সাথে সাথে  সাথে নারী কেও  উৎপন্ন হবার জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রটির সরলার্থ নিম্নরূপ -

হে  ব্রহ্মবিদ্যাদিগুন যুক্ত সবার চেয়ে বড় পরমেশ্বর! আমাদের  রাজ্য মধ্যে  বেদ বিদ্যা দ্বারা প্রকাশ কে প্রাপ্ত বেদ এবং ঈশ্বরকে উত্তম জ্ঞাত ব্রাহ্মণ প্রকারে উৎপন্ন হোক, অতীব শত্রুকে তাড়না দেবার স্বভাব রাখা যার বড় বড় রথ এবং অত্যন্ত বলী বীর ঐরূপ  নির্ভয়  রাজপূত্র সব প্রকারে উৎপন্ন হোক।  কামনা বা দুধ দ্বারা পূর্ণ বাণী বা গাভী  ভার নিয়ে যাবার সামর্থ বড় বলবান ষাড় শীঘ্র চলনকারী ঘোড়া যে বহু ব্যবহার কে ধারনকারী ঐরূপ  স্ত্রী  তথা রথের উপর স্থিত এবং শত্রুকে বিজয়কারী সভার মধ্যে উত্তম সভ্য পুরুষ  উৎপন্ন হোক।  যে বিদ্বান কে সৎকার করে এই রাজার রাজ্য মধ্যে বিশেষ জ্ঞানবান শত্রুকে হটানোকারী পুরুষ উৎপন্ন হোক  আমাদের লোক কে নিশ্চয়যুক্ত কামকাম মধ্যে অর্থাৎ যেই যেই কামনার জন্য প্রযত্ন করে সেই কামনার মধ্যে মেঘ  বর্ষে  ঔষধী বহু উত্তম ফল  আমাদের জন্য  পরিপক্ক হোক আমাদের অপ্রাপ্ত বস্তুকে প্রাপ্তি করানো যোগ কে রক্ষার  সমর্থ হোক।
(অনুবাদঃ দয়ানন্দ সরস্বতী)

এরপর  ঋগবেদ ৮।১৯।৩৬ মন্ত্রের কোন জায়গায় ঈশ্বর পূত্র সন্তানের আশির্বাদ অথবা ঈশ্বরের কাছে পুত্র প্রার্থনা করা হয় নি।  এ মন্ত্রে ঈশ্বরের কাছে ঘোড়া আদি অনান্য পশুর জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে।
মন্ত্রটির সরলার্থ নিম্নরূপ -

পরমদাতা পরমপূজ্য প্রজাপালক  দুষ্টনিবারক, সফল জীবপালক এই পরমদেব আমাদের উপাসককে অনেক জীব, প্রাণী ও অনান্য পশু  দান করেন।
(অনুবাদঃ আর্য মুনি)

=>> অপপ্রচারকারী দাবী
অথর্ব্বেদ ৬।১১ তে ঈশ্বর শুধু ছেলে সন্তান জন্মানোর আশীর্বাদ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, সেই সাথে অশ্বথ গাছের গুড়ি ওষুধ হিসেবেও দিলেন যাতে নাকি নিশ্চিত পুত্র সন্তান হবে।
এরকম আরো অজস্র রেফারেন্স দেয়া যাবে বেদের যেখানে শুধু পুত্র সন্তানের কামনা ও শুধু পুত্র সন্তানকে আশীর্বাদ করা হয়েছে।

জবাবঃ
উক্ত সুক্তটি অথর্বেদের পুংসবন সুক্ত। সুক্তটির কোন মন্ত্রতেই বলা হয় নি যে,  অশ্বথ গাছের গুড়ি দিয়ে পুত্র সন্তান লাভ হয়। মন্ত্রটিতে বলা হয়েছে, বলবান সুদৃঢ পুরুষ শান্ত  উদ্বেগরহিত স্ত্রীতে গর্ভাবধান করবে ইহাই পুত্র প্রাপ্তির বিধান। এখানে  "অশ্বত্থ = অশ্বের ন্যায় শীঘ্রগামী বলবান পুরুষ এবং "শমীম"= শান্ত স্বভাব স্ত্রী। মন্ত্রগুলোতে  অশ্বত্থ এবং শমীম উপমালঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শান্ত, উদ্বেগরহিত স্ত্রীর উপর অশ্বের ন্যায় শীঘ্রগামী সুদৃঢ় পুরুষ গর্ভাধান করে।  ইহাই পুমাণ পূত্র উৎপন্ন হওয়ার বিধান। এই বিধানই পুমাণ পূত্রের প্রাপ্ত করায়িতা"
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা, অঃ ৬।১১।১)

পূত্র ঊৎপন্ন হওয়ার বিধানটি কিরূপ তা পরবর্তী মন্ত্রটিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা আজ ক্রোমোসোম সমন্ধ্যে জানি। ক্রোমোসোম হলো সেটা যা  মানুষের লিঙ্গ নির্ধারন করে অর্থাৎ সন্তান ছেলে হবে না কি মেয়ে।  পুরুষের বীর্য XY ক্রোমোসোম বহন করে এবং নারীদের ডিম্বানু XX ক্রোমোসোম বহন করে।  স্ত্রীর X ডিস্বাণুর সাথে যদি পুরুষের Y শুক্রানুর মিলন হয় তবে  সন্তান ছেলে হবে।  অর্থাৎ  Y ক্রোমসোম যেটা পুত্র সন্তান জন্ম দেয় সেটা শুধুমাত্র পুরুষের বীর্যে থাকে, নারীর ডিম্বানুতে থাকে না ৷ অর্থাৎ ছেলে সন্তান প্রাপ্তি মূলত নির্ভর করে পুরুষের বীর্যে থাকা Y ক্রোমোজোমের উপর ৷ বিজ্ঞানের এই  কথাটিই বেদ মন্ত্রে  স্পষ্টরূপে বলা হয়েছে।  মন্ত্রটি নিম্নরূপ- 

পুরুষ মধ্যে নিশ্চয়ই সেই (পুত্র উৎপাদনকারী) বীর্য আছে যাহা স্ত্রীতে সিঞ্চন করা হয় ৷ ইহাতে অবশ্যই পুত্র প্রাপ্তি সাধন হয় ৷ ইহা প্রজাপালক ঈশ্বর উপদেশ করেন।
(অথর্ববেদ ৬।১১।২)

অর্থাৎ এই মন্ত্রে ঈশ্বর পূত্র সন্তান হবার জন্য কোন আশীর্বাদ দেন নি।  বরং পূত্র সন্তান কিভাবে হয় সেই পদ্ধতিই বলেছেন। যা আধুনিক বিজ্ঞান বর্তমানে আবিষ্কার করেছে। পরবর্তী মন্ত্রটি দেখা যাক -

" প্রজাপতি= পুরুষ এবং অনুমতি = পতির অভিমত পুত্রের চিন্তনকারী স্ত্রী গর্ভধারন এবং পালনে সমর্থ হয়। অন্য দশা মধ্যে বহুত সম্ভব কণ্যাকে গর্ভে ধারন করে পরন্ত এই উক্ত প্রকারে অনুমনন করার মাধ্যমে স্ত্রী পুমাণ পুত্র কে ধারন করেন।
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা, অঃ ৬।১১।৩)
.
এ মন্ত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে, একটি নারী শুধু পুত্রকেই নয় বরং কণ্যাকেও গর্ভে ধারন করেন। অর্থাৎ বেদ শুধু পুত্রকে নয় বরং কণ্যাকেও ধারন করার কথা বলেছে।আর  বেদ থেকে আমরা অনেক রেফারেন্স দিয়েছি যেগুলোতে নারীকে বিভিন্ন মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে।

=>> অপপ্রচারকারীর দাবী
কন্যা সন্তানের উত্তোরধিকারে স্পস্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ঋগ্বেদ ৩।৩১।২ সত্যপ্রকাশ স্বরস্বতি এই মন্ত্রের অনুবাদ করেছেন,"ভাই আপনি ব্যাহেনকো পৈত্রিক ধনকা ভাগ নেহি দেতা", মানে ভাই নিজের বোনকে পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া সম্পদের ভাগ দেবে না। বেদাংগ নিরুক্তে এই মন্ত্রের ব্যাখা করা আছে, নিরুক্ত ৩।৬ 'না যামিয়ে' মানে তাহার বোনের জন্য নয়।

জবাবঃ
উক্ত মন্ত্রে কোথাও কণ্যা পিতার সম্পত্তি পাবেনা এমন কথা লেখা নেই বরং লেখা আছে পুত্র তার পৈত্রিক সম্পত্তি বোনের সাথে ভাগ করবে না। অর্থাৎ পুত্র তার পিতা হতে যে সম্পদ প্রাপ্ত হবে সেটা সে বোনকে দেবেনা ৷ এক্ষেত্রে পিতার সিদ্ধান্তটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি তার সম্পদের কত অংশ পুত্রকে দেবেন আর কত অংশ কণ্যাকে দিবেন ৷ এই মন্ত্রে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে সে যেন তার বোনকে প্রস্তুত করে তাঁর স্বামীর জন্য উপযুক্ত করে ৷ এখানে বরঞ্চ বোনের প্রতি ভাইয়ের দায়িত্ব ফুটে উঠেছে।
.
তবে পিতা অবশ্যই তার কণ্যাকে সেচ্ছায় সম্পত্তি দিতে পারেন ৷ সাধারনত আমাদের সমাজে বিয়ের সময় কণ্যাকে পিতা তার সাধ্যমত সম্পদ দিয়ে থাকেন ৷ বর্তমানে কিছু লোভী লোকের কারনে প্রথাটি কলুষিত হওয়ার কারনে এটি যৌতুক প্রথা হিসেবে এটি নিন্দনীয় হয়ে গেছে ৷ অথচ নিয়ম হলো বরেরা কণের পিতার কাছে কোনকিছু দাবী করতে পারবে না ৷ পিতা স্বেচ্ছায় তার মেয়েকে বিয়ের সময় বা বিয়ের পরে তার সাধ্যমতন ধন দান করবেন ৷ ৷ মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে -

কণ্যাকে বরই বিবাহসময়ে ধন দিবেন এমত নহে, বিবাহের পরেও কি পিতা, কি ভ্রাতা, কি পতি , কি দেবর ইহারা সকলেই যদি অতুল কল্যাণরাশি অভিলাষ করেন তবে কণ্যাকে ভোজনাদি দ্বারা পূজা করবেন ও বস্ত্রালংকার দ্বারা ভূষিতা করবেন। মনুঃ ৩।৫৫"।

মন্ত্রটির সরলার্থ নিম্নরূপ - 

"ভাই নিজ বোনকে পৈতৃক ধনের ভাগ দেবে না।  কিন্তু তার পতির জন্য নব নির্মাণ করার জন্য সক্ষম বানাবে। মাতা- পিতা পুত্র এবং পুত্রীকে উৎপন্ন করে।  তাহার মধ্যে এক (পুত্র) সর্বোৎকৃষ্ট পৈতৃক কর্ম সম্পন্ন করে।  অন্য (পুত্রী) সম্মান যুক্ত শোভা কে ধারন করেন"
( অনুবাদঃ শ্রীরাম শর্মা)
.
এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে,  অপপ্রচারকারী প্রথম থেকে যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছে  তা হলো,  বেদ সবসময় পুত্রকেই কামনা করার কথা বলেছে। কিন্তু এ মন্ত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি, পিতা-মাতা শুধু  পুত্র কেই নয় সাথে পুত্রী অর্থাৎ কণ্যাকেও উৎপন্ন করে।  আর সে পুত্রী সর্বদা সম্মান যুক্ত শোভাকে ধারন করবে।   অর্থাৎ বেদ কখনোই নারীকে অসম্মান করে নি। বরং সর্বদাই নতুন নতুন সংজ্ঞার মাধ্যমে  নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাই ভূষিত করেছে।

=>> অপপ্রচারকারীর দাবী
ঋগ্বেদ ৩।৩১।১১ এ বলা আছে,Grandfather তার কন্যার থেকে যে Grandson লাভ করে তাকেই উত্তরাধীকারী করে,তিনি শুধু সেই Grandson কেই সন্মান ও উপহারসামগ্রী দিবেন। এখানে Grand daughter তথা নাতনীর কোন স্থান নেই।
এই মন্ত্রের ব্যাখায় বেদাংগ নিরুক্ত ৩।৪ এও শুধু নাতীকে উপহার দেয়ার কথা বলা হয়েছে, কন্যা শিশু তথা নাতনীকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে ।

জবাবঃ 
পুত্রহীন পিতার উত্তরাধিকারী বা বংশরক্ষক হবে তার কন্যার নাতি ৷ এই মন্ত্রে এই নির্দেশনাই দেয়া হয়েছে ৷ বেদ পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের প্রথাকে সমর্থন করে ৷ এখানে সম্পদ বন্টনের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি ৷ মনুসংহিতার ৯।১২৭ নং শ্লোকটিও বেদের এই নির্দেশনার উপর ভিত্তি করেই দেয়া হয়েছে ৷

যে লোকের কোন পুত্র সন্তান নেই সে এই বক্ষ্যমান নিয়মে নিজের কন্যাকে ‘পুত্রিকা’রূপে স্থির করবে। কন্যাকে পাত্রস্থ করবার সময় ঐ কন্যার পিতা জামাতার সাথে বন্দোবস্ত করে এই কথা তাকে বলবে- ‘এই কন্যার গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে সে আমার পিণ্ডদানকারী হবে’। (৯।১২৭)।

"বিদ্বান পূত্রহীন পিতা সমর্থবান জামাতার সৎকার করে নিজ পূত্রীর পূত্রকে পূত্রুপে আপন করে নেয়।  যখন পিতা নিজ পুত্রীর বিবাহ যোগ্য প্রস্তুত করে দেয়।  তখন মন অত্যন্ত সুখের অনুভব করে " (ঋকবেদ ৩।৩১।১১)
( অনুবাদঃ শ্রীরাম শর্মা)
.
=>> অপপ্রচারকারীর দাবী
বেদ অনুসারে যে নারীর ভাই নেই, তাকে বিয়ে করতে মানা। ভাই হীন নারী নাকি ভাগ্যবিড়ম্বিত। এজন্যই বেদ লিখল অথর্ববেদ ১।১৭।১ এ,"শরীরের রক্তনালী সেভাবে শক্তিহীন ও নির্জিব হবে যেভাবে ভাই হীন নারীরা নির্জিব ও শক্তিহীন।"
.
এই মন্ত্রটির বিশদ ব্যাখা রয়েছে বেদাংগে, নিরুক্ত ৩।৪ এই মন্ত্রের ব্যাখায় বলছে,"ভাই হীন নারীরা ভাগ্য বিড়ম্বিত সন্তান উৎপাদন এবং যজ্ঞাদীর ক্ষেত্রে, যা ইংগিত দেয় ভাই হীন নারীদের না বিবাহে।"
এর ব্যাখা রয়েছে মনুসংগিতা ৩।১১ এও।দুনিয়াতে হাজার হাজার নারী রয়েছে যাদের ভাই নেই। তাহলে এইসব নারীদের কি হবে ? তারা কি ভাই না থাকায় ভাগ্যবিড়ম্বিতা ? এটি কি কোন সৃষ্টিকর্তার বিধান হতে পারে ?
.
জবাবঃ
এই মন্ত্রে নারীদের মূলত শারিরীক দূর্বলতা বোঝানো হয়নি বরং ভাইহীন বোনের বিপদে আপদে রক্ষনাবেক্ষন, দেখভালের ব্যাপার ও নিরাপত্তার দূর্বলতাকেই তুলে ধরা হয়েছে ৷ এখানে ভুল কিছু নেই ৷ বৈদিক সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক, আর এই সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষরা নারীদের দেখভাল করবে, রক্ষা করবে তাদের বিপদে আপদে পাশে থাকবে ৷ এখানে আমাদের প্রশ্ন একটা বোনের জন্য ভাই কি একটা নির্ভরতার জায়গা না ? বোনকে যেকোন অবস্থায় রক্ষা করা ভাইয়ের কর্তব্য, ঈশ্বর না করুন বোনের শ্বশুড়বাড়ীতে কোন সমস্যা হলে বা বোন অকালে বিধবা হলে বা অসহায় হয়ে গেলে বেদ বিধান অনুসারে ভাইয়ের উপর সেই বোনের দায়িত্ব বর্তায়, বর্তমানে আমাদের হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায়ও এই ব্যবস্থা চালু আছে, এই মন্ত্রে এটাই বোঝানো হয়েছে ৷
.
এবার দেখি মনুসংহিতায় কি বলা হয়েছে:-
যস্যাস্তু ন ভবেদ্ভ্রাতা ন বিজ্ঞায়েত বা (বৈ) পিতা। নোপযচ্ছেত তাং প্রাজ্ঞঃ পুত্রিকাধর্মশঙ্কয়া।। (মনুসংহিতা ৩।১১)

যে কন্যার কোনও ভ্রাতা নেই, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সেই কন্যাকে ‘পুত্রিকা’ হওয়ার আশঙ্কায় অথবা যে কন্যার পিতা সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না তাকে জারজ বা মদ্যপব্যক্তির দ্বারা জাত সম্ভাবনায় অধর্ম হওয়ার ভয়ে বিবাহ করবে না।

[পুত্রিকাঃ ভ্রাতৃহীনা কন্যাকে পিতা ইচ্ছা করলে পুত্রের মত নিজের বংশরক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন, এইরকম কন্যাকে পুত্রিকা বলা হয়। আবার ভ্রাতৃহীনা কন্যার কোনও পুত্র হলে সে নিজে পুত্রস্থানীয় হয়ে সপিণ্ডনাদি কাজ সম্পন্ন করবে- অপুত্রক পিতার এইরকম অভিসন্ধি থাকলে সেই কন্যাকে পুত্রিকা বলা হয়।]

মনুসংহিতায় এই পরামর্শ দেয়া হয়েছে মূলত উত্তরাধিকার বিবেচনায় ৷ অর্থাৎ পুত্রহীন পিতার কন্যাকে বিবাহ দিলে যদি কন্যার পিতা এইরূপ বিবেচনা করে যে কন্যা তার স্বামীর বদলে তার পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবে এবং কন্যার সন্তান কন্যার স্বামীর উত্তরাধিকারী না হয়ে বরং তার পিতার (অর্থাৎ কন্যার পিতার) উত্তরাধিকার হবে সেক্ষেত্রে এ ধরনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে ৷ তবে এটা একটা পরামর্শ এবং এ ধরনের বিবাহ নিষেধ নয় ৷ কারন বেদ ভ্রাতৃহীনা কন্যাকে বিয়ে করতে কোথাও নিষেধ করেনি, এবং মহাভারতে অর্জুন উলুপীকে এ ধরনের বিবাহ করেছিলেন ৷ এটা অনেকটা ঘর জামাই থাকার মত অবস্থা যেটা নিষিদ্ধ না হলেও সন্মানজনক নয় ৷ এক্ষেত্রে কন্যার পিতা তার উদ্দেশ্য গোপন না করে বিষয়টি কন্যা ও তার হবু জামাইয়ের সাথে আলোচনা করে নিতে পারেন এক্ষেত্রে তারা সইচ্ছায় এটা মেনে নিয়ে পরষ্পর বিবাহ করলে এতে কোন অসুবিধা নেই ৷
অন্যদিকে পুত্রহীন পিতা যদি তার কন্যাকে পুত্রিকা না করেন এবং এ বিষয়ে পরিষ্কার থাকেন তাহলে আর কোন কথাই থাকে না ৷ যেটা সাধারনত আমাদের বাঙালী হিন্দুসমাজে হয়ে থাকে ৷
অপরদিকে পুত্রহীন পিতা তার ভাইয়ের পুত্রকেও নিজের উত্তরাধিকারী করতে পারেন এতে কোন অসুবিধা নেই ৷ অথবা তিনি কোন পুত্রকে দত্তকও নিতে পারেন।
.
মন্ত্রটির সরলার্থ নিম্নরূপ -
"শরীরের মধ্যে লাল রক্তের বহনকারী যে ধমনী তাহা স্থির হয়ে যায়।  সেই প্রকার ভাই রহিত নিস্তেজ বোন বাহিরে বের হতে পারে না।  সেই প্রকার ধমনির রক্তও বাহিরে বের হয় না।"
(অনুবাদঃ শ্রীরাম শর্মা)
.
=>> অপপ্রচারকারীর দাবী
নারীদের মাসিককে বেদে প্রচন্ড ঘ্রিনার সাথে দেখা হয়েছে। বেদ স্পস্টভাবে বলছে, অথর্ববেদ ১৪।১।২৭ "নারী পিরিয়ড চলাকালে স্বামী যদি স্ত্রীর কাপড় দিয়ে তার শরীরের কোন অংশ ঢাকে তবে স্বামীর পবিত্র ও সুন্দর শরীরটি অপবিত্র হয়ে যাবে।
.
জবাবঃ
প্রথমত এ মন্ত্রে নারীর পিরিয়ডের কথা বলাই হয় নি। এই মন্ত্রে মূলত পুরুষদের  যে নারীদের বস্ত্র পড়া উচিত নয় তারই বর্ণনা এসেছে। আর পিরিয়ড চলাকালীন অথবা না চলাকালীন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর কাপড় কখনোই পড়বে না। কারন এটা অশ্লীলতা এবং পাপ কর্ম।বেদ এই বিধানটিই মূলত এখানে দিচ্ছে। তো এখানে কোথাই নারীর পিরিয়ড কে ঘৃণা করা হলো?পুরুষদের যেমন নারীদের পোষাক পড়া উচিত নয় তেমনি নারীদেরও উচিত নয় পুরুষদের পোষাক পড়া।এটাই সামাজিকতা এবং উত্তম ব্যবহার। আর যদিও এ মন্ত্রে পিরিয়ডের কথা নেই তবুও একটা কথা সত্যি যে, নারীদের পিরিয়ডের সময় তার কাপড় আলাদা রাখা উচিত,  এটাই স্বাস্থসম্মত। এখানে আপত্তি করার মতো তো কিছু নেই।
.
মন্ত্রটির সরলার্থ নিম্নরূপ - 
"চমৎকার হওয়া শরীর সেই পাপ কর্ম দ্বারা অশ্লীল হয়ে যায়, যখন পতি বধুর বস্ত্র দ্বারা নিজ অঙ্গকে আচ্ছাদন করে"
(অনুবাদঃ ক্ষেমকরন দাস ত্রীবেদী)

=>> নিয়োগ প্রথা কি এবং কেনঃ
নিয়োগ বিধি হচ্ছে একটি সংস্কার ৷ বিধবা মহিলা অর্থাৎ যে সকল মহিলার স্বামী মারা গেছেন অথচ তার কোন সন্তানসস্তুতি নেই এবং যে সকল মহিলার স্বামী আছেন কিন্তু তিনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম সেই মহিলা তার স্বামী ও বয়োজ্যোষ্ঠ ব্যাক্তির অনুমতিক্রমে একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সকলের নিকট গ্রহনযোগ্য ব্যাক্তিকে সন্তান জন্মদানের সৎ উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানোকেই নিয়োগ প্রথা বলে। নিয়োগ প্রথার কিছু শর্তসমুহ রয়েছে যা নিয়োগের জন্য পালন করা একান্ত জরুরী।

১)একজন নারী এই প্রথা অনুসরন করবে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের জন্য, যৌন আনন্দ লাভের জন্য নয় ৷
২) নিয়োগকৃত পুরুষ এই কাজটি করবেন ধর্মের জন্য, নারীকে সন্তান উৎপাদনে সাহায্যের জন্য, যৌন আনন্দ লাভের জন্য নয়।
৩) এই উপায়ে জন্মগ্রহনকৃত সন্তান স্বামী স্ত্রীর সন্তানরূপে বিবেচিত হবে, নিয়োগকৃত পুরুষের সন্তানরূপে বিবেচিত হবে না।
৪) ভবিষ্যতে নিয়োগকৃত পুরুষ সন্তানের পিতৃত্ব দাবী করতে পারবে না ৷
৫) অপব্যবহার রোধের জন্য একজন পুরুষ তার সারা জীবনে ৩ বার নিয়োগকৃত হতে পারবে ৷
৬) এই কাজকে ধর্ম হিসেবে দেখা হবে যাতে নারী, পুরুষের মনে এই ব্যাপারে কোন আকাঙ্খা বা লোভ জন্ম না নেয়, একজন পুরুষ এই কাজটি নারীকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে করবে আর নারী এই কাজটি করবে তার ও তার স্বামীর জন্য সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে।
৭) এই প্রথায় কোনো শৃঙ্গার হবে না, কোনোরূপ যৌন ক্রিয়া হবে না, শুধুমাত্র লিঙ্গ প্রবেশ ছাড়া।
৮) সেখানে একটা অর্ধস্বচ্ছ আচ্ছাদন থাকবে যা দিয়ে নারীরর উর্দ্ধাঙ্গ ঢেকে দেয়া হবে এবং নিয়োগকৃত পুরুষ শুধুমাত্র নারীর নিম্নাঙ্গ দেখার অনুমতি লাভ করবে যাতে সে শুধুমাত্র নিয়োগ কর্ম সমাধা করতে পারে ৷
৯) তাদের শরীর ঘৃতাক্ত করে নিতে হবে ৷

এখানে উল্লেখ্য যে প্রথমতঃ বিষয়টির সাথে স্বামী ও অন্যান্য বয়োজ্যোষ্ঠ ব্যাক্তির অনুমতির ব্যাপার আছে এবং দ্বিতীয়তঃ এই প্রথাটি যৌন পরিতৃপ্তির সাথে মোটেই সম্পর্কযুক্ত নয় বরং এটা সমাজ ও পরিবারের একান্ত প্রয়োজন অনুসারেই শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের জন্যই এই প্রথা অনুশীলন করা হয় ৷

=>> অপপ্রচারকারীর দাবীঃ
মানবসমাজের যতগুলো ঘৃন্য প্রথা রয়েছে নিয়োগ তার মধ্যে অন্যতম। এই প্রথা অনুসারে একজনের স্ত্রীকে একাধিক পুরুষের সাথে শয্যায় যেতে হয়, তাদের সাথে সেক্স করতে হয়। এটি সবচেয়ে বেশি করা হয় বিধবা নারীর সাথে, এজন্যই ঋগবেদ ১০।৮৫।৪৫ বেদ নারীকে আশির্বাদ দিচ্ছে ১০ টি সন্তান ও ১১ টি স্বামীর  সাথে নিয়োগ করতে।
এই মন্ত্রের ব্যাখায় স্বামী দয়ানন্দও তার সত্যার্থপ্রকাশ এর ১৩২ পৃষ্টায় লিখেছে স্ত্রী নিয়োগ দ্বারা একাধিক স্বামী গ্রহন করবে।

জবাবঃ 
এটি কখনই কোন জঘন্য প্রথা নয়, বরং বিভিন্ন বিধি নিয়ম পালন করেই নিয়োগ করা হতো। প্রধানত রাজ পরিবারগুলোতে এবং অধিক ভূসম্পত্তির অধিকারী পরিবারগুলোতে বংশ পরম্পরা রক্ষা এবং উত্তরাধিকারীর জন্যই এ প্রথা পালন করা হতো ৷ সাধারনত হিন্দু সমাজ পিতৃতান্ত্রিক এবং পিতার দিক থেকেই বংশ পরিচয় এবং উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়, এ অবস্থায় ধনাঢ্য পরিবারগুলোর স্ত্রীদেরকে অন্যত্র বিয়ে দেয়া হলে সেই স্ত্রীলোকের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানেরা পরবর্ত্তীতে ঐ (দ্বিতীয়বার বিবাহিত) নারীর দ্বিতীয় স্বামীর উত্তরাধিকারীরূপে পরিচিতি লাভ করবে। এ অবস্থায় ঐ নারীর প্রথম স্বামীর পরিবার বিনাশের পথে যেতে পারে ৷ এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্যই এই বিধি পালন করা হতো ৷আমরা যদি বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকাই তবে আমরা দেখব বিভিন্ন দেশে স্পার্ম ডোনেট বা শুক্রানু দানের একটা বিষয় আছে, তাদের দেশে এমনকি ব্লাড ব্যাংকের ন্যায় শুক্রানু ব্যাংকও আছে। যার মাধ্যমে অনেক সন্তানহীনা নারী মাতৃত্বের স্বাদ অনুভব করতে পারছে। এই ব্যাপারটা অনেকটাই নিয়োগপ্রথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।।

আর ঋগবেদ ১০।৮৫।৪৫  এ কোথাও ১১ জন পুরুষের সাথে নিয়োগ করতে বলা নেই।  মন্ত্রটিতে বলা হয়েছে,

"হে সর্বশক্তিমান প্রভু, তুমি পর্যাপ্ত দাতা, ইহাকে (পত্নীকে) উত্তম পুত্রযুক্ত উত্তম ভাগ্যশালী কর দশবার ইহাকে পুত্র দান করে পতিকে একাদশতম কর" ’দশাস্যাং পুত্রানা ধেহি কৃধি’ পতি - স্বামী আমাকে দশ সন্তান । ধেহি - দাও ( প্রার্থনা)  পতিমেকাদশং- পতিকে নিয়ে হবে ১১ জন ৷ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী সত্যার্থ প্রকাশে ঠিক এই ব্যাখ্যাটিই করেছেন।

=>> অপপ্রচারকারীর দাবী 
এই নিয়গের কথা আরো আছে ঋগ্বেদ ১০।৪০।২ এ, বলা আছে, "যেভাবে বিধবা তার দেবরকে বিছানায় ডাকে"তবে আধুনিক সুশীল অনুবাদকরা এরকম একটি লাইন লিখতে পারে নি, তারা এটাকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে অনুবাদ করেছে। কিন্তু তারা নিজেদের বেদাংগ  নিরুক্ত ৩।১৫ কে কিভাবে বাদ দিবে ?

জবাবঃ
প্রথমে আমরা নিরুক্ত ৩।১৫ দেখে নেই।  সেখানে স্পষ্ট বলা আছে,  "দেবরঃ কস্মাদ্ দ্বিতীয় বর উচ্যতে "  অর্থাৎ বিধবার দ্বিতীয় বর কে দেবর বলে।  কিন্তু বেদ, নিরুক্ত বিষয়ে অনভিজ্ঞ এসব কুবুদ্ধিদের মস্তিষ্ক থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা কি সম্ভব? আর যদি বিধবা দ্বিতীয় বর লাভ করে তবে এখানে দোষের কি হলো? যার কারনে আধুনিক সুশীল অনুবাদকরা এরকম একটি লাইনও  লিখতে পারলো না?

"হে অশ্বিনীগন (নারী ও পুরুষগন), তোমরা রাত্রীতে কোথায় ছিলে ? দিবসে কোথায় ছিলে ? কোথায় তোমরা খাবার ও আশ্রয় খুজে পেয়েছ ? কোথায় তোমার নিবাস ? কোথায় শয়নস্থান ? যেভাবে একজন বিধবা দ্বিতীয় স্বামীর সাথে, যেভাবে স্বামীর সাথে স্ত্রী থাকে (সেভাবে কোথায়) তোমরা একত্রে থেকেছ?
.
অতএব পরিশেষে বলতে চাই যে, বেদ ন্যায়, নীতি এবং সত্য বিদ্যার সমষ্টিরূপ জ্ঞান। যা ঈশ্বর বিভিন্ন ঋষিদের হৃদয়ে প্রকাশ করেছে।  তাই বেদ ঈশ্বরীয় জ্ঞান হওয়ার দরুন এতে অমানবিক কিছুই বলা নেই।

ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি

No comments:

Post a comment