বেদের আবির্ভাব ও তার প্রকৃত বিশ্লেষণ - VedasBD.com

Breaking

Tuesday, 28 May 2019

বেদের আবির্ভাব ও তার প্রকৃত বিশ্লেষণ



বেদ মন্ত্র কিভাবে প্রকট হয়েছে? এই প্রশ্ন সমস্ত বিদ্বান নিজ নিজ রূপে স্পষ্টিকরণ করেছেন। বেদ কে অনাদিকালের ঈশ্বরীয় জ্ঞান মান্যকারী ঋষিদের বেদ মন্ত্রের দ্রষ্টা মান্য করা হয়। কারন ঈশ্বর সেই পবিত্র আত্মা ঋষিদের মধ্যে বেদ বাণীর প্রেরণ করেন। এছাড়া বেদ কে অপুরুষেও জ্ঞান বলা হয় । তাছাড়া বেদের জ্ঞান মানুষের জন্য পরিপূর্ণ কিন্তু ঈশ্বরের জন্য পরিপূর্ণ নয় এ বিষয়ে বেদে উল্লেখ রয়েছে -
.
বৃহস্পতে প্রথমং বাচো অগ্ৰং য়ত্প্রৈরত নামধেয়ং দধানাঃ। য়দেষাং শ্রেষ্ঠং য়দরিপ্রমাসীত্প্রেণা তদেষাং নিহিতং গুহাবিঃ।। ”(ঋকবেদ ১০/৭১/১)
.
শব্দার্থ ➠ বৃহস্পতে=সেই জ্ঞানের স্বামীর প্রথমম্= অত্যন্ত বিস্তারিত বাচঃ অগ্ৰম্=বাণীর অগ্ৰস্থানে স্থিত এই বেদজ্ঞান।নামধেয়ং দধানাঃ=প্রভুর নাম হৃদয়ে ধারণ করে অনান্য ঋষিগণ এবং বিচারশীল ব্যাক্তিরা য়ত্=সেই বেদজ্ঞান প্রৈরত= নিজের মধ্যে প্রেরণ করলেন। এষাম্=সৃষ্টির প্রারম্ভে উৎপন্ন সেই সমস্ত ব্যাক্তিদের মধ্যে য়ত্=যে শ্রেষ্ঠম= সর্বোত্তম ছিল য়ত=যে অরিশম্=একেবারে নির্দোষ ছিল,যার বুদ্ধি এবং মন সর্বাধিক পবিত্র আসীত্=ছিল তত্=সেই এষাম্=শ্রেষ্ঠ গুহা=হৃদয়রুপ গুহায় প্রেণা=প্রভুর প্রেমের জন্য নিহিতম্=এই বেদ জ্ঞান স্থাপিত হয়েছে এবং আবিঃ=প্রকট হয়েছে।
.
ভাবার্থ ➨ প্রভুর দেওয়া বেদবাণী এই সৃষ্টির প্রারম্ভিক শব্দ ছিল। সর্বশ্রেষ্ঠ হৃদয়ে এই বেদবাণীর প্রকাশ ঘটেছিল এবং তাদের দ্বারা বিস্তার হয়েছিল।
.
বেদ বাণী অনাদি অনন্ত এবং সনাতন। বেদ কে ঈশ্বরীয় জ্ঞান রুপে ঋষি মহর্ষিরা নিজেদের অন্তরে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তারপর প্রকট করেছেন।
.
নিরুক্তকার যাস্ক আরো বলেছেন -
"সাক্ষাত্কৃতধর্মোণ ঋষয়ো বভূবুস্তেহবরেভ্যোহসাক্ষাত্ কৃতধর্মস্য উপদেশেন মন্ত্রানসম্প্রাদু ; নিরুক্ত ১।১৯"
.
অর্থাৎ তপের বল দ্বারা যারা ধর্মের সাক্ষাৎ করেছেন তারাই (ধর্মের সাক্ষাৎ দ্রষ্টা ঋষি)। আর তাহারাই  যারা ধর্মের সাক্ষাৎ করে নি তাদের উপদেশ দিয়েছেন।
.
ইহাতে স্পষ্ট হয় যে, জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার প্রণালী এই যে জ্ঞান বাণীর সাথে ঋষির হৃদয়ে প্রকট হয় এবং সেই জ্ঞানের গ্রাহক ঋষি সংসারে প্রচলিত করেন।
-
এখন আমাদের জানা আবশ্যক যে, এই বেদ কাহার মধ্যে প্রকট হয়েছে।  শতপথ ব্রাহ্মণে এ বিষয়ে বলা হয়েছে -
তেভ্যস্তপ্তেভ্যস্ত্রয়ো বেদা অজায়ন্তে ঋগ্বেদো বায়োর্যজুর্বেদঃ সূর্যাৎ সামবেদঃ।
.
(শতপথ ব্রাহ্মণ ১১।৫।৮।৩)অর্থাৎ সেই তপস্বী ঋষির মাধ্যম দ্বারা পরমাত্মা অগ্নি থেকে ঋগবেদ, বায়ু থেকে যজুর্বেদ এবং সূর্য থেকে সামবেদ প্রকট করেছেন।
.
অর্থাৎ সেই তপস্বী ঋষির মাধ্যম দ্বারা পরমাত্মা অগ্নি থেকে ঋগবেদ, বায়ু থেকে যজুর্বেদ এবং সূর্য থেকে সামবেদ প্রকট করেছেন ।
.
আপত্তিঃ প্রজাপতির্বা ইদমগ্র আসীদিতি (শত০ ১১/৫/৮/১-৪) এখানে স্পষ্ট লিখিত যে, তপ দ্বারা প্রজাপতি তিন লোক কে বানিয়েছেন ।এবং ওই তিন লোক কে তপিয়ে অগ্নি, বায়ু, সূর্য এই তিন জ্যোতিকে সৃষ্টি করেছেন। এবং এই তিন জ্যোতিকে তপিয়ে তিন বেদ কে সৃষ্টি করেছেন । তাহলে অগ্নি, বায়ু, সূর্য - এই তিন' জ্যোতিতত্ত্ব নাকি ঋষি?
.
মীমাংসাঃ  প্রথমত এরা কখনও জ্যোতিতত্ব হতে পারে না  কারণ জড় পদার্থে জ্ঞানের প্রকাশ বা কার্য অসম্ভব। এবং যে যে স্থানে অর্থ সম্ভব, সেখানে লক্ষণ হয়ে থাকে। অর্থাৎ যে লক্ষণ ধরলে ওই কার্য বা অর্থ সম্ভব সেখানে সে অনুযায়ী অর্থ করতে হয়। যেমন  কোন সত্যবাদী ধর্মাত্মা বিদ্বান আপ্ত পুরুষ যদি বলে যে, "ক্ষেত্র মধ্য মঞ্চ শব্দ করিতেছে"  যেমন এস্থলে লক্ষণ দ্বারা এরূপ বুঝতে হবে,  যে মঞ্চের স্বয়ং শব্দ করা অসম্ভব,  অতএব মঞ্চন্থ কোন ব্যক্তি শব্দ করছে।  সেরূপ এস্থলে বোঝা উচিৎ যে, মনুষ্যের দ্বারা বিদ্যার প্রকাশ হওয়া সম্ভব জড় দ্বারা নয়।  এ বিষয়ে "তেভ্যঃ" শব্দ দ্বারা বলা হয়েছে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য আদি ঋষিদের মধ্যে পরমেশ্বর বেদ প্রেরণ করেছিলেন। যদি এই জ্ঞান ঋষির মধ্য দিয়ে বেদ প্রকাশ না হয়ে থাকে তবে কি জ্ঞানশূণ্য, জড় তত্ত্ব হইতে  নির্গত হয়েছিলো ? একটু বুদ্ধি পূর্বক বিচার করুন। উক্ত পাঠের পূর্ণাঙ্গ  যথার্থ অর্থ  হচ্ছে -
.
প্রজাপতির্বা ইদমগ্র আসীত্। এক এব সোহকাময়ত স্যাং প্রজায়েয়েতি সোশ্রাম্যত্স তপোতপ্যত তস্মাচ্ছান্তান্তেপানাত্ ত্রয়োলোকা অসৃজ্যন্ত পৃথিব্যন্তরিক্ষং দ্যৌ ।১।। 

 স ইমাঁস্ত্রীংলোকানভিততাপ । তেভ্যস্তপ্তেভ্যস্ত্রীণি জ্যোতিংষ্যজায়ন্তাগ্নির্য়োয়ং পবতে সূর্যঃ।২।।

 স ইমানি ত্রীণী জ্যোতীংষ্যভিততাপ । তেভ্যস্তপ্তেভ্যস্ত্রয়ো বেদা অজায়ন্তাগ্নের্ঋগ্বেদো বায়োর্যজুর্বেদঃ সূর্যাত্সামবেদঃ।৩।।
.
 স ইমাঁস্ত্রীন্ বেদানভিততাপ । তেভ্যস্তপ্তেভ্যস্ত্রীণি শুক্রাণ্যজায়ন্ত ভূরিণ্যৃগ্বেদাদ্ ভূব ইতি যজুর্বেদাৎ স্বরিতি সামবেদান্তদৃগ্বেদেনৈব হোত্রমকুর্বত যজুর্বেদেনাধ্বর্যবং সামবেদেনোদ্গীথং যদেব ত্রয়্যৈ বিদ্যায়ৈ শুক্রংতেন ব্রহ্মত্বমথোচ্চক্রাম।৪।।
(শত০ ১১/৫/৮/১-৪)
.
ভাষ্যার্থঃ - এই এক ই প্রজাপতি প্রথমে ছিলেন । তিনি ভাবলেন আমি প্রজার সহিত হয়ে যাবো । উনি জ্ঞানপূর্বক প্রযত্ন করলেন। সেই জ্ঞাণ তথা যত্ন হইতে তিনি তিন লোক সৃষ্টি করলেন -পৃথিবী, অন্তরিক্ষ, দ্যৌ।১।।
.
- তিনি এই তিন লোককে রচনা করলেন, এই তিন লোক রচনার পর তিনি সংসার কে জ্ঞান হইতে প্রকাশিত করার জন্য তিন প্রকাশমান ঋষিকে জন্মপ্রদান করেন - অগ্নি, বায়ু, সূর্য। ২।।
.
- তিনি এই তিন জ্যোতিস্মান ঋষিদিগকে জ্ঞানপ্রদান করেন। এবং তাহারা জ্ঞানবান হওয়ার পর তিন বেদ প্রকাশিত হয় । অগ্নি হতে ঋগ্বেদ , বায়ু হতে যজুর্বেদ, সূর্য হতে সামবেদ। ৩।।
.
- তিনি এই তিন বেদকে প্রকাশিত করেন- এবং প্রকাশিত হওয়ার পর তিন শক্তির জন্ম হয় ।ভূঃ ঋগ্বেদ হতে , ভূবঃ যজুর্বেদ হতে, স্বঃ সামবেদ হতে। তাই ঋগ্বেদ দ্বারা হবন সম্পন্ন হয় , যজুর্বেদ দ্বারা অধ্বর্যু ঘী হবন সম্পন্ন হয় , সামবেদ দ্বারা মঙ্গল গাওয়া হয় এবং এই তিন বিদ্যা হতে জ্ঞাণবান হয়ে ব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়।।৪।।
-
এবার বলুন, এখানে তিন জ্যোতির তত্ত্ব কথা নাকি ঋষি ? জ্ঞান তত্ত্ব কি কোন জড় পদার্থ হতে নির্গত হওয়া সম্ভব না কি সজীব প্রাণ হতে?

আপত্তিঃ "য়ো বৈ ব্রহ্মাণং বিদধাতি" (শ্বেতাঃ ৬।১৮) এই বচন অনুসারে দেখা যায় যে, পরমেশ্বর ব্রহ্মার হৃদয়ে বেদোপদেশ প্রদান করছিলেন। তাহার পর পুণরায় অগ্নি ইত্যাদি ঋষিদের আত্মায় করলেন কেন?
.
মীমাংসাঃ এই শ্লোকের বর্ণনা এইরূপ যে , পরমাত্মা প্রথমে ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করেন অতঃপর তাহার জন্য বেদ প্রেরণ করেন। কিন্তু বেদ কিভাবে প্রেরণ করেন তাহার কোন বর্ণনা নেই।   সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমাত্মা সমস্ত সৃষ্টি রচনার পর প্রথমে যোগী ঋষি আদিদের  সৃষ্টি করেন-
"তেন দেবা অযজন্ত সাধ্যা ঋষশ্চ যে " (যজুর্বেদ ৩১।৯)
.
অর্থাৎ সেই পরমাত্মা প্রথমে  বিদ্বান,  সাধনকারী,  ঋষিদের সৃষ্টি করেন  যারা সেই পরমেশ্বরের  উপাসনা করেন।
.
য়স্মাত্পক্বাদমৃতং সংবভূব য়ো গায়ত্র‍্যা অধিপতির্বভূব।য়স্মিন্বেদা নিহিতা বিশ্বরুপাস্তেনৌদনেনাতি তরাপি মৃত্যুম্।।”(অথর্ববেদ ৪/৩৫/৬)
.
শব্দার্থ ➠ (য়স্মাত্পক্বাত) যেই জ্ঞানের পরিপাক থেকে (অমৃতং সংবভূব) অমৃতের উৎপত্তি হয়। জ্ঞানের এর পরিপাক হলে নিষ্পাপ হওয়া যায়। এই নিষ্পাপতা নিরোগতা এবং অমৃতত্ত্বের সাধন হয়।(য়ঃ) যে জ্ঞান (গায়ত্র‍্যাঃ) গায়ত্রীর (অধিপতির্বভূব) অধিপতি (য়স্মিন্) যেই জ্ঞানে (বিশ্বরুপাঃ) সমস্ত সত্য বিদ্যার নিরূপণকারী (বেদাঃ নিহিতা) বেদ নিহিত আছে অর্থাৎ যে জ্ঞানের দ্বারা নির্দিষ্ট (তেন ওদনেন) সেই জ্ঞানরূপ ভোজনে (মৃত্যুম্ অতিতরাণি) মৃত্যুকেও অতিক্রম করা যায়।
.
বেদের পাঠ এবং বেদের শিক্ষার আচরণ করলে সুখ প্রাপ্তি হওয়া যায়।
.
এছাড়াও মনুস্মৃতিতেও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে -
কর্মাত্মনাং চ দেবনাং সোহসৃজত্ প্রাণিনাং প্রভূঃ।
সাধ্যানাং চ গণং সুক্ষং যজ্ঞং চৈব সনাতনম্।। (মনু ১।২২)

- সেই পরমাত্মা কর্মশীল  অগ্নি, বায়ু আদি দেব  কে এবং মনুষ্য,  পশু পক্ষি আদি এবং সাধক আদি বিদ্বান কে তথা সনাতন যজ্ঞ উৎপন্ন করেছেন।
.
এই সৃষ্টি আদির মধ্যে অগ্নি, আদি ঋষি এবং ব্রহ্মাও ছিলো।  তখন পরমাত্মা ব্রহ্মা কে এই অগ্নি আদি ঋষি দ্বারা বেদ প্রেরণ করেছিলেন। এ বিষয়ে মনুস্মৃতিতে রয়েছে -
অগ্নিবায়ুরবিভ্যস্তু ত্রয়ং ব্রহ্ম সনাতনম্।
দুদোহ যজ্ঞসিদ্ধ্যর্থমৃগযজুঃ সামলক্ষণম্।। (মনুস্মৃতি ১।২৩)

সেই ব্রহ্মা যজ্ঞ সম্পাদনের জন্য অগ্নি, বায়ু, সূর্য এই তিনটি দেবতা হতে যথাক্রমে ঋক, যজু, সাম সংজ্ঞক তিনটি সনাতন বেদ দোহন করেছিলেন। অর্থাৎ তাদের দ্বারা প্রাপ্ত করেছিলেন।
.
অতএব এটা স্পষ্ট যে, ব্রহ্মা অগ্নি আদি দ্বারা বেদ প্রাপ্ত করেছেন।  এখন শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের যথার্থ ভাষ্য দেখুন -
-
যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্ব যো বৈ বেদাংশ্চ প্রহিণোতি তস্মৈ।
তং হ দেবং আত্মবুদ্ধিপ্রকাশং সুমুক্ষুর্ব শরণমহং।।
(শ্বেতাঃ ৬।১৮)

ভাষ্যার্থঃ যিনি প্রথমে চার বেদের জ্ঞাতা ঋষি কে উৎপন্ন করেছেন। যিনি নিশ্চয় করে ব্রহ্মার জন্য চার বেদের প্রকাশ অগ্নি, বায়ু আদি ঋষি দ্বারা স্থাপিত করেন,  সেই আত্মবুদ্ধি প্রকাশ কারী পরমাত্মদেবের শরণেই আমি মোক্ষের ইচ্ছুক নিশ্চয়রূপে হয়ে যাই।
.
আপত্তিঃ  এই সব রচনা ব্রহ্মাই করেছে "অগ্নিবায়ুরবিভ্যস্তু" মনুস্মৃতি ১।২৩ এই শ্লোকে  ব্রহ্মা "দুদোহ" ক্রিয়ার কর্তা অর্থাৎ , এই শ্লোকে ব্রহ্মা কর্তা ও দোহন ক্রিয়া- এর অর্থ অগ্নি, বায়ু , রবি হতে ব্রহ্মা বেদ' কে দোহন করেছেন।
.
মীমাংসাঃ এই সারা সংসারের রচনা পরমাত্মা দ্বারা সংগঠিত হয়েছে। যার মধ্যে অগ্নি আদি তথা ব্রহ্মাদি ঋষিও শামিল। "অগ্নিবায়ুরবিভ্যস্তু" এই শ্লোকে ব্রহ্মা হলেন কর্তা তথা ঋগ্যযুঃ সাম এবং অগ্নি আদি ঋষি কর্ম এবং দোহন ক্রিয়া রয়েছে। দোহা' ধাতু দ্বিকর্মক তথা "ণ্যন্তগর্ভা"। অতঃ অর্থ ইহা হয় যে, -'পরমাত্মা অগ্নি, বায়ু , আদিত্য  দ্বারা ব্রহ্মাকে চারবেদ প্রাপ্ত করিয়েছেন । যখন আপনার সংস্কৃত ব্যকরণ আসে না , শুধু শুধু তা ব্যর্থ আওড়ানো কি প্রয়োজন ?
.
আপত্তিঃ  মনুস্মৃতির উক্ত অগ্নি, বায়ু আদি কে "দেব" বলা হয়েছে  অর্থাৎ এগুলো নিশ্চয় কোন ভৌতিক দেবতা।  আর  মনু এবং  শতপথে এই উভয়ে অগ্নি, আদিত্য, বায়ু এই তিনের নাম এসেছে। তবে চতুর্থ অঙ্গিরা কোথা থেকে আসলো?
.
মীমাংসাঃ আপনি দেবের সংজ্ঞা নিশ্চয় পুরোটা জানেন না নতুবা এমন কথা বলতেন না। শতপথ ব্রাহ্মণ ৩।৭।৩।১০ এ বিদ্বানদের দেব বলা হয়েছে। নিরুক্তাকার যাস্ক বলেছেন - 
"দেবো দানদ বা, দীপনাদ্ বা, দৌতনাদ বা, দ্যুস্থানো ভবতীতি বা; নিঃ ৭।১৫। 
.
অর্থাৎ দেবের লক্ষন হচ্ছে দান। সবার হিতার্থে যে দান করে সে দেব। দেবের গুণ হচ্ছে দীপন অর্থাৎ প্রকাশ করা। দেবের কর্ম হচ্ছে দৌতন অর্থাৎ সত্যপদেশ করা। অর্থাৎ যে মানুষ সত্য মানে, সত্য বলে এবং সত্য উপদেশ দান করে সে দেব। আর  চতুর্থ নাম অঙ্গিরা অথর্ববেদের সাথে স্বয়ং এসেছে,  এজন্য উক্ত তিনের সাথে তাহার নাম দেওয়া হয় নি। শতপথেই অথর্ববেদের সাথে ঋষি অঙ্গিরার নাম যুক্ত।  দেখুন -
.
 "যদথর্বাঙ্গিরসঃ স য় এবম্ বিদ্বানোথর্বাঙ্গিরসো অহরহঃ স্বাধ্যায়মধীতে।" (শত০ ১১।৫।৬।৭।)

"এবং বা অরেস্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বাসতমতদ্ যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোহর্থবাঙ্গিরসঃ।। (শতপথঃ ১৪।৫।৪।১০)

উণাদিকোষ ৪।২৩৬ এ ও " অঙ্গিরসিঃ অঙ্গিরাঃ " শব্দ এসেছে।  এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে-
.
অঙ্গিরাঃ অঙ্গেতি প্রাপ্নোতব জানাতি বা স, অঙ্গিরাঃ।  ঈশ্বরোহগ্নির্ঋষিষির্ভিদো বা। তস্যাপত্যমাঙ্গিরসঃ।

আপত্তিঃ  'ব্রহ্মা দেবানাং প্রথমঃ' ইত্যাদি (মুন্ডকোপনিষদ ১।১।১-২) এখানে ব্রহ্মা দ্বারাই সৃষ্টির আরম্ভে বেদের প্রকাশ , এমনই লিখিত আছে ।
.
মীমাংসাঃ  আপনি যে পাঠ দিয়েছেন এই পাঠে না আছে সৃষ্টির আরম্ভের বর্ণন , না আছে ব্রহ্মা দ্বারা চার বেদ প্রকট হওয়ার উল্লেখ। এখানে যে ব্রহ্মার বর্ণনা করা হয়েছে তা  সৃষ্টির আরম্ভযুক্ত ব্রহ্মা প্রতীত হয় না । কেননা সৃষ্টির আরম্ভযুক্ত ব্রহ্মার পুত্রের গণনা যাহা পুরাণ শাস্ত্রে আছে , তাহা- মরিচি, অত্রি, অঙ্গিরা,  পুলস্ত্য ,পুলহ, ক্রতু , ভৃগু, বশিষ্ট,  দক্ষ, নারদ (ভাগবতঃ ৩।১২।২১-২২) আদি নাম তো ব্রহ্মার পুত্রেরই পাওয়া যায় , কিন্তু অথর্বা নামক ব্রহ্মার পুত্র কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায় না ।

ইহাতে বোঝা যায় যে, মুন্ডকোপনিষদের ব্রহ্মা পৌরাণিক ব্রহ্মা ছিলেন না বরং সেখানে(মুন্ডক) অন্যকোন ব্রহ্মা ছিলেন যিনি তার পুত্র অথর্বাকে ব্রহ্মবিদ্যা পড়িয়েছেন। আর উক্ত পাঠে  "প্রথম"  অর্থ শ্রেষ্ঠ তথা প্রসিদ্ধ অর্থাৎ 'বিদ্বানমধ্যে প্রসিদ্ধ ব্রহ্মা নামক ঋষি।' পুরো পাঠের অর্থ দেখুন-
.
ব্রহ্মা দেবানাং প্রথমঃ সম্বভূব বিশ্বস্য কর্তা ভুবনস্য গোপ্তা।
স ব্রহ্মবিদ্যাং সর্ববিদ্যাপ্রতিষ্ঠাম্ অথর্বায় জ্যেষ্ঠপুত্রায় প্রাহ।।১।
.
অথর্বণে যাং প্রবদেত ব্রহ্মাহথর্বা তাং পুরোবাচাঙ্গিরে ব্রহ্মবিদ্যাম্।
স ভারদ্বাজায় সত্যবহায় প্রাহ ভারদ্বাজোহঙ্গিরসে পরাবরাম্।।২।
(মুন্ডকোপনিষদ্ ১।১।১-২)
.
ভাষ্যার্থঃ ব্রহ্মা বিদ্বানের মধ্যে প্রথম (মুখ্যস্থানিয়) উদ্ভুত হয়ে জগতে ধর্মের কর্তা অর্থাৎ প্রাণীর রক্ষার উপদেশ দাতা তিনি ব্রহ্ম বিদ্যার সর্ব বিদ্যানিষ্ঠাত অথর্বা কে যিনি তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলো তাহাকে উপদেশ প্রদান করেন। প্রথমে অথর্বাকে ব্রহ্মা যে
বিদ্যার উপদেশ করেন , অথর্বা অঙ্গিরা ঋষিকে সেই ব্রহ্মবিদ্যা সম্বন্ধে বলেন। তিনি (অঙ্গিরা) ভরদ্বাজ গোত্রযুক্ত সত্যবাহকে , এবং সত্যবাহ অঙ্গিরা ঋষিকে ব্রহ্ম বিদ্যার উপদেশ করেন।
.
আপত্তিঃ  "স ব্রহ্মবিদ্যাম্" মুন্ডকের এই শ্রুতিতে ব্রহ্মা আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র অথর্বাকে বেদ পাঠ করিয়েছেন এবং অথর্বা অঙ্গিরাকে , অঙ্গিরা সত্যবাহকে বেদ উপদেশ করেন - যেখানে বেদ ক্রম রয়েছে , তা কি মিথ্যা ?
.
মীমাংসাঃ এই ক্রমকে আমরা মিথ্যা বলছি না । কিন্তু এই ক্রম পৌরাণিক চতুর্মুখ ব্রহ্মার ও নয় কারণ পুরাণ শাস্ত্রে কোথাও ব্রহ্মার পুত্র অথর্বার বর্ণন নেই । এবং কেননা প্রত্যেক চার বেদ বক্তার নামই ব্রহ্মা । নিরুক্তে বলা হয়েছে - "ব্রহ্মা সর্ববিদ্যঃ সর্ব বেদিতুমর্হতি। ব্রহ্মা পরিবৃল্হঃ শ্রুততো ব্রহ্মা পরিবৃহল্হং সর্বতঃ।।(নিঃ ১।৮)
.
 ব্রহ্মা তাহাকে বলে যিনি সর্ববিদ্যার জ্ঞাতা,  যিনি সব কিছু জানার যোগ্য,  ব্রহ্মা তাহাকে বলেন যিনি ত্রয়ি বিদ্যা জানে।   অতঃপর এই ক্রম কোনো অন্য ব্রহ্মার ; যাহার পুত্রের নাম অথর্বা ছিলো । এটা দ্বারা ব্রহ্মার উপর বেদ প্রকট হওয়া সিদ্ধ হয় না । বরং অগ্নি আদি ঋষির মধ্যে দিয়ে বেদ প্রকাশের প্রমাণ, ঐতেরীয় ব্রাহ্মণেও উপস্থিত। দেখুন - "বেদা অজায়ন্ত ঋগ্বেদ এবাগ্রেরজায়ত যজুর্বেদো বায়োঃ সামবেদ,আদিত্যা" (ঐতেরীয় ব্রা০ পঞ্চিকা৫ অঃ২৫।৩২) বেদের,উৎপত্তি ঋগ্বেদ অগ্নি হইতে , যজুর্বেদ বায়ু হইতে,সামবেদ আদিত্য হইতে।
.
এই প্রমাণ হতে সিদ্ধ হয় যে, চার বেদ চতুর্মুখ ব্রহ্মা দ্বারা প্রকট হয়নি বরং অগ্নি আদি  ঋষি দ্বারা পরমাত্মা প্রকট হয়েছে এবং তাদের দ্বারা ব্রহ্মা ঋষিকে প্রাপ্ত করিয়েছেন ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

No comments:

Post a Comment