ওঁ তত্ত্বের আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ - VedasBD.com

Breaking

Monday, 15 April 2019

ওঁ তত্ত্বের আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ


ওঁ তত্ত্ব 

ওঁ কে বলা হয় অক্ষরব্রহ্ম। অর্থাৎ নিরাকার পরমব্রহ্মের রূপ। শুধু সনাতন ধর্মেই নয়, সকল ধর্মে, সকল ঐশ্বরিক কিছুর মাঝেই রয়েছে এর অবস্থান। ওঁ বা ওঁ-কার [সংস্কৃত, অ + উ +ম্]। বা প্রণব বা ত্র্যক্ষর হিন্দুধর্মের পবিত্রতম ও সর্বজনীন প্রতীক।
.
ঊপনিষদেও বর্ণিত আছে এর মহাত্ম্য-
যেমন খ্রিস্টান এবং ঈহুদীগণ পরম ভক্তি বুঝাতে যে “আমেন” ব্যবহার করে থাকেন তাও এই ওঁ এরই পরিবর্তিত রুপ। এমনকি শিক ধর্ম ও প্রতিষ্ঠীত “ইক ওমকার” বা এক ওম (ওঁ) এর ভিত্তিতে। এই প্রতীকের দেবনাগরী রূপ ॐ, চীনা রূপ 唵, এবং তিব্বতীয় রূপ ༀ। ঠিক তেমন ভাবেই ওঁ এর পরবর্তি রূপ ঔঁ। কিন্তু এতে পরমব্রহ্মের কোন প্রকার বিকৃতি হয় না বরং সঠিক উচ্চারণ হেতু এই অক্ষর ব্যাবহার করা হয়। যেহেতু এটি নিরাকার পরমব্রহ্ম সেহেতু এটিকে অক্ষর না বলে শব্দ বলাই শ্রেয়।
.
ইংরেজীতে “omni” শব্দটা কোন কিছুর বিশালতা, অসীমতা বুঝাতে ব্যবহার করা হয়, সেটা এই “ ওঁ ” থেকেই আগত। যেমনঃ omnipresent, omnipotent ইত্যাদি।
.
ওঁ এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বেদে। এবং পরবর্তিতে উপনিষদে এর কথা বলা হয়। যজুর্বেদের ২;১৩, ৪০;১৫, ৪০;১৭ এবং ঋগবেদ ১;৩;৭ এ ওঁ এর উল্লেখ আছে।
.
মান্ডুক্য উপনিষদ কেবল ওঁ এর মহাত্ম্য বর্ণনাতে উৎসর্গ ও বৈদিক সাহিত্যে ওঁ কে ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম এর স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। (যোগ দর্শণ ১;২৭-১;২৮)
.
ওঁ শব্দটি সংস্কৃত ‘অব’ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যা একাধারে ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে প্রযোজ্য। এই বুৎপত্তি অনুযায়ী ওঁ-কার এমন এক শক্তি যা সর্বজ্ঞ, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের শাসনকর্তা, অমঙ্গল থেকে রক্ষাকর্তা, এছাড়াও ওঁ-কারকে ত্র্যক্ষরও বলা হয়, কারণ ওঁ তিনটি মাত্রাযুক্ত – ‘অ-কার’, ‘উ-কার’ ও ‘ম-কার’। ‘অ-কার’ ‘আপ্তি’ বা ‘আদিমত্ত্ব’ অর্থাৎ প্রারম্ভের প্রতীক। ‘উ-কার’ ‘উৎকর্ষ’ বা ‘অভেদত্ব’-এর প্রতীক। ‘ম-কার’ ‘মিতি’ বা ‘অপীতি’ অর্থাৎ লয়ের প্রতীক। অন্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সংঘটনকারী ঈশ্বরের প্রতীক।
.
এছাড়াও এই তিন বর্ণ দ্বারা বোঝানো হয়ঃ 
অ-বিরাট, অগ্নি এবং বিশ্ব‌। উ-হিরণ্যগর্ভ, বায়ু এবং তৈজস‌।
.
ম-ঈশ্বর, আদিত্য এবং প্রাজ্ঞ‌। ‘প্রণব’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ, ‘যা উচ্চারণ করে স্তব করা হয়’। এর অপর অর্থ, ‘যা চিরনূতন’।
.
ওঁ-কার ঈশ্বরের সকল নামের প্রতিনিধিস্বরূপ ও তাঁর শ্রেষ্ঠ নাম। বেদ, উপনিষদ, গীতা ও অন্যান্য হিন্দুশাস্ত্রে সর্বত্রই ওঁ-কারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অথর্ব বেদের গোপথব্রাহ্মণের একটি কাহিনি অনুসারে দেবরাজ ইন্দ্র ওঁ-কারের সহায়তায় দৈত্যদের পরাস্ত করেন। এই কাহিনির অন্তর্নিহিত অর্থ, ওঁ-কারের বারংবার উচ্চারণে মানুষ তার পাশব প্রবৃত্তি জয় করতে সমর্থ হয়। কঠোপনিষদ মতে, ওঁ-কার পরব্রহ্ম। মুণ্ডক উপনিষদে ওঁ-কার অবলম্বনে ঈশ্বরোপাসনার কথা বলা হয়েছে। গীতায় শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন, তিনি সকল অক্ষরের মধ্যে ওঁ-কার। অর্থাৎ ওঁ-কারই পরমব্রহ্ম।


এছাড়াও মনুসংহিতায় বলা হয়েছে→↓↓
ওঙ্কারপূর্বিকাস্তিস্রো মহাব্যাহৃতয়েহিব্যায়াঃ
ত্রিপদা চৈব সাবিত্রী বিজ্ঞেয়ং ব্রহ্মণো মুখম।।(মনু ২।৮১)
.
অর্থাৎ পূর্বে ওঙ্কার এবং অবিনাশী মহাব্যাহৃতি(ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণপূর্বক ত্রিপদী গায়ত্রী হল ব্রহ্ম প্রাপ্তির একমাত্র উপায় বলে জানবে।
.
মনু ২।৮৩ বলছে সাবিত্র্যাস্ত পরং নাস্তি... অর্থাৎ গায়ত্রীর চেয়ে উৎকৃষ্ট মহামন্ত্র আর কিছুই নেই।
.
পবিত্র বেদের ৪ টি ভাগেই পরমাত্মা গায়ত্রী জ্ঞান প্রদান করেছেন এমন ই এই মহিমা।সকল হিন্দুধর্মালম্বীদের জন্যেই এই মন্ত্রে উপনয়ন-দীক্ষা নেয়া নিয়ম বলে ঘোষণা করেছে বৈদিক সকল শাস্ত্র।
.
গায়ত্রী মন্ত্র- 
তৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
.
তৈত্তিরীয় আরণ্যক (২। ১১। ১-৮) অনুযায়ী, গায়ত্রী পাঠের আগে ওঁ-কার, মহাব্যাহৃতি(ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণ করতে হয়।তাই একে পড়া হয় এভাবে-
.
ওঁ ভূ র্ভুবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।

অনুবাদ - (ওঁম)পরমাত্মা (ভূঃ) প্রাণস্বরূপ (ভূবঃ)দুঃখনাশক ও (স্বঃ) আনন্দস্বরূপ। (সবিতুঃ) জগদুৎপাদক (দেবস্য) দিব্য গুণযুক্ত পরমাত্মার (তৎ) সেই (বরেণ্যম) বরণীয় (ভর্গঃ) শুদ্ধ স্বরূপকে (ধীমহি) ধ্যান করি।(য়ঃ) যিনি (নঃ) আমাদের (ধিয়ঃ) নির্ম্মল বুদ্ধি (প্রচোদয়াৎ) প্রেরণা দান করেন।

(ঋগ্বেদ ৩।৬২।১০।যজুর্বেদ ৩।৩৫,২২।৯,৩০।২, ৩৬।৩...
সামবেদ উত্তরার্চিক, প্রপাঠক ৩, অর্দ্ধপ্রপাঠক ৩, মন্ত্র ১০।)
.
ভাবার্থঃ হে পরমাত্মা। তুমি প্রাণস্বরূপ, প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম এবং প্রাণের প্রাণ।সমস্ত প্রকারের দুঃখ বিনাশক এবং সুখস্বরূপ। সমস্ত জগতের অধিকর্তা এবং সর্বোত্তম বলে তুমিই একমাত্র বরণ যোগ্য। তোমার শুদ্ধস্বরূপ দিব্য জ্যোতিকে আমরা হৃদয়ে ধ্যান করি। হে ঈশ্বর! কৃপা করে অজ্ঞানতাজনিত পাপ দূর করে আমাদের হৃদয়ে নির্মল বুদ্ধির প্রেরণা প্রদান করো।
.
গায়ত্রী বেদের এবং সনাতন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামন্ত্র। পরমাত্মার ধ্যানের জন্য গায়ত্রীই সিদ্ধ বৈদিক মন্ত্র। এই মন্ত্রের ঋষি বিশ্বমিত্র এবং দেবতা সবিতা।মহাঋষি বিশ্বামিত্র সর্বপ্রথম ধ্যানে এই মন্ত্রের মর্ম উপলদ্ধি করে প্রচার করেছিলেন। মন্ত্রের দেবতা বা বিষয় সবিতা অর্থাৎ জগৎ স্রষ্টা ব্রহ্ম। বেদারম্ভ সংস্কারে আচার্য এই মন্ত্রে ব্রহ্মচারীকে দীক্ষা দান করেন। এই মন্ত্রের ছন্দের নাম গায়েত্রী।
.
গায়ৎ--ত্রৈ (পালনে + ড কর্ত্তরি, স্ত্রীত্বে ঈপ্ = গায়েত্রী, "গায়ন্তং ত্রায়তে যস্মাৎ গায়ত্রী সা ততঃ স্মৃতা।" গানকারীকে ত্রাণ করে বলেই এর নাম গায়েত্রী। সমগ্র বেদের জ্ঞান সূক্ষ্ম ভাবে গায়েত্রী মন্ত্রে নিহিত আছে বলে একে বেদমাতা বলা হয়। গায়ত্রী মন্ত্রে দশটি শব্দ আছে ---- তৎ, সবিতুঃ, বরেণ্যম্, ভর্গঃ, দেবস্য, ধীমহি, ধিয়ঃ, য়ো, নঃ, প্রচোদয়াৎ।
.
গায়ত্রী ছন্দের তিন পাদ এবং তিনটি পাদই স্বতন্ত্রভাবে অর্থ প্রকাশ করে। তিন পাদে বিভক্ত করিলে মন্ত্রটি এরূপ হবে

১) তৎসবিতুর্বরেণ্যম। (২) ভর্গো দেবস্য ধীমহি। (৩) ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ। প্রত্যেক পাদে আটটি করে অক্ষর থাকবে কিন্তু প্রথম পাদে সাতটি অক্ষর আছে। মন্ত্রে মোট ২৪টি অক্ষরের স্থানে ২৩টি অক্ষর আছে। ইহাকে নিচৃৎ গায়ত্রী বলে। এক অক্ষর বেশী হইলে 'ভুরিক' গায়ত্রী বলা হত। তাই তিন-শব্দাংশযুক্ত "বরেণ্যং" কে "বরেণীয়ং‌" উচ্চারণ করতে হবে।
.
ছান্দেগ্য উপনিষদ ঘোষণা করেছে-
গায়ত্রী বা ইদং সর্বং ভুতং যদিদং কিঞ্চ বাগ্বৈ গায়ত্রী।
বাগবা ইদং সর্ব ভুতং গায়তি চ ত্রায়তে চ।।
(ছান্দোগ্য উপনিষদ ৩।১২।১)
.
অনুবাদ- এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যাহাই কিছু দেখা যায়, তাহার মধ্যে বাণীরাজ রাজেশ্বরী গায়ত্রীগুরু বাণীই সর্বশ্রেষ্ঠ। সমস্ত সংসারের সকলেরই একই মান্যতা। কেবল গায়ত্রী মন্ত্রই সকলেরই একমাত্র মুক্তির পথ।
.
তাই সবাই সর্বদা মহামন্ত্র গায়ত্রী জপ করুন,মনকে শুদ্ধ করুন ও ঈশ্বর ভাবনায় নিযুক্ত হোন।



ওম শান্তি শান্তি শান্তি





No comments:

Post a Comment