আসুন দেখে নিই শ্রীকৃষ্ণ যোগেশ্বর না কি পরমেশ্বর - VedasBD.com

Breaking

Monday, 28 January 2019

আসুন দেখে নিই শ্রীকৃষ্ণ যোগেশ্বর না কি পরমেশ্বর


অনেকে বলে থাকে গীতার ৪,৮নং শ্লোক কৃষ্ণের বাণী নয়এগুলো ঈশ্বরের বাণী। তাহলে গীতার ৪৫ ও ৬নং শ্লোক কার বাণীতাছাড়া গীতা ৯১১ নং শ্লোকে তো ঈশ্বর নিজেকে মনুষ্য শরীরধারীবলেছেনাকি এখানেও কৃষ্ণ ও ঈশ্বরের বাণীর মধ্যে পার্থক্য আছে?
প্রশ্ন - গীতার ৪।৭নং শ্লোকে অবতারের কথা বলা আছে।
আর আপনি বলেছেন মুক্ত আত্মারা দেহ ধারণ করে অবতরণ করতে পারে, তবে পরমাত্মা বা ঈশ্বর অবতরণ করে না পরমাত্মা বা ঈশ্বর যে অবতরণ করে না তার প্রমাণ বেদ থেকে দেখিয়েছেন এখন মুক্ত আত্মারা যে অবতরণ করে এর কোন শাস্ত্রীয় প্রমাণ দেখাতে পারবেন???
উত্তর-অবশ্যই দেখাতে পারবো, এর প্রমাণের জন্য গীতার
ঐ শ্লোকই যথেষ্ট। গীতার ৪।৭ এই বলা আছে যে- যখন যখনই ধর্মের গ্লাণি হয় ও অধর্ম বেড়ে যায় ,তদা অর্থাৎ তখনই অহম অর্থাৎ আমি আত্মানং অর্থাৎ আত্মাকে(যোগী ধর্মাত্মাদের) সৃজামি অর্থাৎ সৃষ্টি তথা প্রকাশ করি। (গীতা ৪।৭)
এখানে বলা হয়নি যে ঈশ্বর নিজে সৃষ্টি হন বা অবতরণ করেন, কারণ এমন কোন স্থান অবশিষ্ট নেই যেখানে ঈশ্বর থাকে না। এখানে মূলত বলা হয়েছে ঈশ্বর জীবাআত্মাকে  প্রকাশ করেন। ধর্মের যখন গ্লানি হয় তখন সময়ে সময়ে আমরা এই ধরণে ধর্মাত্মাদের দেখেছি। এখন যারা অযথা কুতর্ক করে বলবেন যে ঐ শ্লোকে "আত্মানং " বলতে মূলত নিজেকে তথা কৃষ্ণজীকে বুঝিয়েছেন। তাদের এটাই বলতে চাই যে এই ক্ষেত্রেও ঈশ্বরের অবতরণ তত্ব টিকে না। কারণ আপনাদের কথা মত এটা শ্রীকৃষ্ণেজীর কথা। তাহলে আপনাদের কথা মতে তিনি নিজেই বলছে যে যখন যখন ধর্মের গ্লানি হয় ও অধর্ম বেড়ে যায় তখন কৃষ্ণজী অবতরণ করে। আর মুক্তি প্রাপ্ত জী (শ্রীকৃষ্ণজী ও মুক্ত আত্মা) যে নিজের ইচ্ছা মত অবতরণ করতে পারেন তা নিচের কিছু উদাহরণ থেকে প্রমাণ হয়।
শতপথ ব্রহ্মণ গ্রন্থ থেকে দেখুন-
"শৃণ্বন্ শ্রোত্রং ভবতি, স্পর্শয়ন্ ত্বগ্ভবতি, পশ্যন চক্ষুর্ভবতি,রসয়ন্ রসনা ভবতি, জিঘ্রন্ ঘ্রাণং ভবতি, মন্বানো মনো ভবতি, বোধয়ন্ বুদ্ধির্ভবতি, চেতয়ঁশ্চিত্তম্ভবত্যহঙকুর্বাণো হঙ্কারো ভবতি।।" 
(শতপথ ব্রাহ্মণ কাং ১৪) 
অর্থাৎ মুক্তি অবস্থায় জীবাত্মা শুনিতে ইচ্ছা করিলে স্বশক্তি দ্বারাই শ্রোত্র, স্পর্শ করিতে ইচ্ছা করিলে ত্বক, দেখিবার সংকল্প হইলে চক্ষু, স্বাদ গ্রহণের জন্য ঘ্রাণ, সংকল্প বিকল্প করিবার জন্য মন, নিশ্চয় করিবার জন্য বুদ্ধি, স্মরণ করিবার জন্য চিত্ত, অহংবুদ্ধির জন্য যেমন ইন্দ্রিয়গোলকের দ্বারা স্বকার্য সিদ্ধ করে সেইরূপ মুক্তি অবস্থায় স্বশক্তি দ্বারা সমস্ত আনন্দ ভোগ করে।"এর থেকে একেবারে নিশ্চত ভাবে যানা যায় যে মুক্ত আত্মারা চাইলে অবতরণ করতে পারেন। কৃষ্ণজীও মুক্ত আত্মা ছিলেন, যার ফলে তিনি ইচ্ছা করেছিলেন যে যখনই ধর্মের গ্লাণি হয় অধর্ম বেড়ে যায় তখন সাধুদের রক্ষার জন্য তিনি অবতরণ করে। এই অবতরণ মুক্ত বা মোক্ষ প্রাপ্ত জীবাত্মার হয়,ঈশ্বর বা পরমাত্মার বা পরমেশ্বরের বা পরমব্রহ্মের নয়।
মুক্ত আত্মারা যে দেহধারণ করে তার আরো কিছু প্রমাণ দেখুন, ছান্দগ্যোপনিষদ ও বেদান্ত সূত্রেও বলা আছে যে মুক্ত জীবাত্মারা তা পারেন।
প্রমাণ দেখুন-
"ভাবং জৈমিনিঃ, বিকল্পামননাৎ" (বেদান্তসূত্র ৪।৪।১১)
অর্থাৎ মুক্ত আত্মার দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি থাকে, ইহা  জৈমিনি মুনির মত। কারণ শাস্ত্রে বলা আছে যে, তারা নানা রূপ দেহধারণ করার ক্ষমতা আছে। তিনি(মুক্ত জীবাত্মা) এক প্রকার থাকেন, তিন প্রকার হন, পঞ্চ প্রকার, সপ্ত প্রকার এবং নব প্রকার হন...।"
.
দেখুন, ছান্দগ্যোপনিষদ ও বেদান্ত সূত্রেও বলা আছে যে মুক্ত জীবাত্মারা তা পারেন প্রমাণ দেখুন
(ছান্দোগ্যোপনিষদ ৭।২৬।২)
এছাড়াও তিনি যে যা ইচ্ছা তাই পেয়ে থাকেন তথা করতে পারেন তার প্রমাণ আরো দেখুন-
"তিনি যদি পিতৃলোক কামনা করেন, তবে তাহার
সঙ্কল্পমাত্রই পিতৃগণ তাঁহা সহিত মিলিত হন...।
মাতৃলোক কামনা করলে মাতৃগনের সহিত মিলিত হন... ভাতৃলোক কামনা করলে তাদের সহিতও মিলিত হতে
পারেন... । ভগিনীলোক কামনা করলে, বন্ধুলোক কামনা করলে তাদের সহিতও মিলিত হন। এক কথায় যাহা চান
তাহাই প্রাপ্ত হন।"
(ছান্দোগ্য_উপনিষদ ৮।২।১-১০)
বোধ করি কৃষ্ণজীও মুক্ত আত্মা বা মোক্ষলাভ করা আত্মাই ছিলেন। তাই আপনাদের গীতা ভাষ্য মতে এই
সিদ্ধান্তেই উপনিত হওয়া যায় যে তিনি মুক্ত আত্মা। আর পরমাত্মা বা ঈশ্বর যে অবতরণ করে না তা যজুর্বেদের ৪০।৮ নং মন্ত্রে স্পষ্ট করেই বলা আছে।
গীতা ৪।৫ ও ৬নং শ্লোকের ব্যাখ্যা দেখুন। এই শ্লোকদ্বয় কৃষ্ণের, পরমেশ্বর বা ঈশ্বরের নয়। দেখুন-
“আমি জম্মরহিত, অক্ষয় আত্মা, জীবসমূহের ঈশ্বর হয়েও নিজের অন্তরঙ্গ শক্তিকে বা স্বভাবকে আশ্রয় করে মায়ার দ্বারা দেহ ধারণ করি।”(গীত ৪।৬)
ব্যাখ্যা- পূর্বের শ্লোকে মানে গীতা ৪।৫ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে-আমার ও তোমার বহু জম্ম অতীত হয়েছে।
অথচ গীতার ৪।৬ নং শ্লোকে বলা হয়েছে তিনি জম্মরহিত। তাহলে কি এই দুই শ্লোকের মধ্যে বিরোধ বিদ্যমান? প্রকৃত পক্ষে তা নয়, কারণ ৫নং শ্লোকে মোক্ষ বা মুক্তি প্রাপ্ত জীবাত্মা শ্রীকৃষ্ণ যে পূর্বে পাপ পূর্ণ রূপ কর্মফলে আবদ্ধ হয়ে দেহধারণ হয়েছিল অর্থাৎ জম্মগ্রহণ করেছিলেন তা স্বীকার করেছেন। আর ৬নং শ্লোকে তিনি নিজের ইচ্ছায় অবতরণের কথা বলেছেন। কেননা সকল মুক্ত আত্মারা নিজের ইচ্ছা শক্তি দ্বারা দেহ ধারণ করতে পারেন। আর এই ভাবে দেহধারণকেই অবতরণ বলে (কিন্তু জম্ম নয়) ও জ্ঞানীরা ঐ মুক্ত জীবাত্মাকে বলে অবতার। আর তিনি এটাও বলেছেন যে তিনি অক্ষয় আত্মা(জীবাত্মা), আমরা সকলেই জানি কোন জীবাত্মারই ক্ষয় নেই।
গীতার ৪।৬নং শ্লোকে তিনি বলেছেন আত্মমায়ায় দেহধারণ করেন, আর মোক্ষ প্রাপ্ত আত্মারা তা পারেন। তার প্রমাণ বেদান্ত সূত্র থেকে দেখুন-
.
সংকল্পাদেব তু তচ্ছ্রুতেঃ
(বেদান্ত সূত্র ৪।৪।৮.)
অর্থাৎ ইচ্ছামাত্র মুক্ত আত্মারা তাদের সঙ্কল্প সিদ্ধ করতে পারেন।”
গীতা ৪।৬নং শ্লোকে তিনি নিজেকে  জীবসমূহের ঈশ্বর বলেছেন। ইহারও একটা কারণ আছে, বেদান্ত সূত্র থেকে দেখুন-
.
অত এব চানন্যাধিপতিঃ
(বেদান্ত সূত্র ৪।৪।৯.)
অর্থাৎ সেই স্থানে মুক্ত আত্মার কোন অধিপতি নাই। কারণ তখন তিনি স্বাধীন ও সতন্ত্র থাকেন।”
সংসার জগতে যেমন প্রধান অপ্রধান থাকে, মুক্তিতে সেইরূপ থাকে না বলেই তিনি নিজেকে সংসারে আবদ্ধ সকল জীবের ঈশ্বর বলেছেন। কারণ ঐ সময় তিনি সংসারে আবদ্ধ সকল জীবের চেয়ে উন্নত ছিলেন, কারণ তিনি মুক্ত ছিলেন। তবে এটাও জেনে রাখা উচিত মুক্ত জীবাত্মা সর্বশক্তির অধীশ্বর নয়, বেদান্ত সূত্রে ইহা স্পষ্ট বলা আছে। প্রমাণ দেখুন-
.
ভোগমাত্রসাম্যলিঙ্গাচ্চ।।
(বেদান্ত সূত্র ৪।৪।২১.)
অর্থাৎ শুধুমাত্র ভোগ্য ব্যাপারে পরমেশ্বর ও মুক্ত জীবাত্মার মধ্য সাম্যভাব আছে। সর্বশক্তিমত্তা বিষয়ে নয়।”
আরো জেনে রাখা উচিত যে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত মুক্ত আত্মা সৃষ্ট্যাদি ব্যাপার ব্যতীত অপর সর্ববিধ শক্তির অধিকারী হন। প্রমাণ দেখুন-
.
জগদ্ব্যাপারবর্জম্ প্রকরণাৎ অসন্নিহিতত্বাচ্চ।।
বেদান্ত সূত্র ৪।৪।১৭
অর্থাৎ মুক্ত আত্মা সৃষ্ট্যাদি শক্তি ব্যাপার ব্যতীত অন্য ক্ষমতার অধিকারী হন।”
এখন গীতার ৯।১১ ও ১২নং শ্লোকের ব্যাখ্যা করা হল-
“(মুঢ) মূর্খ লোক (মাম) আমাকে (মানুষীং, তনু আশ্রিতম)  মানুষের শরীরে আশ্রিত বলে (অবজানন্তি) অবজ্ঞা করে, (ভূতমহেশ্বরম) সর্ব প্রাণীর মহান ঈশ্বর (মম, পরম ভাবম অজানন্ত) আমার পরমভাবকে না জানার কারণে।”
গীতা ৯।১১
.
এই শ্লোক মধ্যে মূলত শ্রীকৃষ্ণজীর মধ্যে প্রকটিত ঈশ্বরের পরমভাবের কথা বলা হয়েছে। আর এটা ঈশ্বরেরই বাণী, কৃষ্ণের নয়। কিন্তু ঈশ্বরের জন্ম মান্যকারী লোক ইহার অর্থ করেছে যে, কৃষ্ণকে পরমেশ্বর না জানার কারণে সেই সময়ে লোক তাকে অবজ্ঞা করেছিলো এবং তাদেরকে কৃষ্ণজী মুঢ বলেছেন। এই টীকাকারের এই অর্থ যদি সত্য মানাও যায় তবেও কৃষ্ণের ঈশ্বরাবতার হওয়া সিদ্ধ হয় না। কারন সেই সময়ের লোক কৃষ্ণকে তখনই মনুষ্য = শরীরধারী জেনেছিলো যতক্ষন তাদের মধ্যে ভৌতিক শরীরের ভাব ছিলো।
.
আর আমাদের মতে ইহার অর্থ এই যে, মুক্ত পুরুষ কৃষ্ণের আত্মায় ঈশ্বর প্রকটিত হয়েছেন এবং অনেকে ঈশ্বরের এই পরম ভাবকে বুঝতে না পেরে, ঈশ্বর মনুষ্য শরীর ধারণ করেছে বলে অবজ্ঞা করেছে এবং এখনো করছে। ঈশ্বর বা পরমাত্মাতো সর্বত্রই বিরাজমান, আর এটাকে আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে সর্ব প্রাণীর হৃদয়েই বিদ্যমান বলা চলে। কিন্তু সকলের হৃদয়ে বা শরীরে পরমাত্মা প্রকটিত বা আশ্রিত হয় না। কিছু কিছু লোক এটা বুঝে উঠতে পারেনা তথা স্বীকার করেনা, তাদের মধ্যে অনেকে বলে ঈশ্বর কি করে মানুষ হল? আবার অনেকে বলে ঈশ্বর নাকি অবতার রূপে মানুষ্য শরীর ধারণ করে। কিন্তু উপরের শ্লোকটা এই দুই প্রকৃতির মানুষদের ধ্যান ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিল। কারণ এখানে মূলত যোগী, ধর্মাত্মা ও মুক্ত আত্মাদের শরীরে কি করে পরমাত্মা প্রকটিত বা আশ্রিত হয় তাই বর্ণনা করা হয়েছে।

এই কারণেই গীতা ৭।২৪ এ ঈশ্বর বলেছেন যে-
.
“অল্প বুদ্ধি ব্যক্তিগণ আমার(ঈশ্বরের) নিত্য সর্বোৎকৃষ্ট পরম স্বরূপ না জানায় অব্যক্তম প্রাকৃত মনুষ্যবৎ ব্যক্তিভাবাপন্ন মনে করে।” (গীতা৭।২৪)
যোগী, ধর্মাত্মা, ও মুক্ত আত্মাদের শরীরে পরমাত্মা কিভাবে প্রকটিত হয় সেই সম্পর্কিত বেদেরও একটি মন্ত্র দেখুন-
.
য়েনেদং ভূতং ভুবনং ভবিষ্যৎপরিগৃহীতমমৃতেন সর্বম্।
য়েন য়জ্ঞস্তায়তে সপ্তহোতা তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু।।”

যজুর্বেদ ৩৪।৪
অনুবাদ- “হে জগদীশ্বর! যদদ্বারা যোগীগণ ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান কার্য জানিতে পারেন, যাহা অবিনাশী জীবাত্মাকে পরমাত্মার সহিত মিলিত করিয়া সর্বপ্রকারে ত্রিকালজ্ঞ করে, যাহাতে জ্ঞান ও ক্রিয়া আছে, যাহা পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও আত্মার সহিত সংযুক্ত এবং যা দ্বারা যোগীগণ যোগরূপে যজ্ঞের বৃদ্ধি সাধন করেন, আমার মন সেই যোগবিজ্ঞান সম্পন্ন হইয়া অবিদ্যাদি ক্লেশ হতে দূরে থাকুক।”
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি


No comments:

Post a comment