শ্রীমদ্ভাগবত গীতার ১০/২১ শ্লোক নিয়ে মিথ্যা অপ্রচারের জবাব - VedasBD.com

Breaking

Monday, 21 January 2019

শ্রীমদ্ভাগবত গীতার ১০/২১ শ্লোক নিয়ে মিথ্যা অপ্রচারের জবাব


গীতার ১০/২১ এ "জ্যোতিষ্কের মধ্যে সূর্য্য এবং নক্ষত্রের মধ্যে চন্দ্র আমি " এই অংশটুকু নিয়ে
জ্যোতিষশাস্ত্রীয় জ্ঞানের অভাবে অনেকের মধ্যে সন্দেহের উৎপত্তি হয় এবং  গীতায় বৈজ্ঞানিক ভুল খুঁজতে থাকে অল্পজ্ঞ ব্যক্তিগণ। কেননা বিজ্ঞানের ভাষায় চন্দ্র পৃথিবীর উপগ্রহ। চলুন এই শঙ্কারসমাধান করা যাক।

প্রথমতঃ গীতার উক্ত শ্লোকের প্রচলিত অর্থ দেখি :

আদিত্যানামহং বিষ্ণুর্জ্যোতিষাং রবিরংশুমান্ ।
মরীচির্মরুতামস্মি নক্ষত্রাণামহং শশী ।।
গীতা ১০.২১
=>>দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে আমি বিষ্ণু নামক আদিত্য । জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে আমি কিরণমালী সূর্য । মরুৎগণের মধ্যে আমি মরীচি এবং নক্ষত্রগণের মধ্যে চন্দ্র ।


অধিকাংশ অনুবাদক আদিত্যের ব্যাখ্যাতে পৌরাণিকমতে দ্বাদশ আদিত্যের নাম বলেছেন
দেখা যাচ্ছে এই সকল নাম সূর্যের প্রতিশব্দ মাত্র । কিন্তু উক্ত শ্লোকে আদিত্য বলতে সূর্য অর্থ করা অনুচিত । কারণ এ শ্লোকেই
বলা হয়েছে "জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে আমি কিরণমালী সূর্য " । সুতরাং যদি বিষ্ণু দ্বারা সূর্যই বোঝাতো তবে জ্যোতিষ্কের বেলাতে আলাদা করে বলা হতো না ।

আদিত্য সম্পর্কে প্রশ্ন উপনিষদে ১.১১ বলা হয়েছে -

पञ्चपादं पितरं द्वादशाकृतिं दिव आहुः परे अर्धे पुरीषिणम् ।
अथेमे अन्य उ परे विचक्षणं सप्तचक्रे षडर आहुरर्पितमिति ।।
 পঞ্চপাদং পিতরং দ্বাদশাকৃতিং দিব আহুঃ পরে অর্ধে পুরীষিণম্ ৷
অথেমে অন্য উ পরে বিচক্ষণং সপ্তচক্রে ষডর আহুরর্পিতমিতি ৷৷

 =>>কালবিদগণ আদিত্যকে পঞ্চপাদযুক্ত,দ্বাদশ আকৃতি বিশিষ্ট,দ্যুলোকের পরার্ধে অবস্থিত,জলবর্ষণকারী পিতা বলিয়াছেন । অপর কালবিদেরা বলেন-উর্ধ্বদেশে ৭টি চক্র ও ৬টি অরবিশিষ্ট রথে স্থিত নিপুণ আদিত্যে এই জগৎ স্থিত

১ম আদিত্য=সংবৎসর । ১
২টি আকৃতি=১২টি মাস
৫ পদ=৫ ঋতু[হেমন্ত ও শীত একত্রে ১টি ধরে]

২য় আদিত্য=সূর্য
৭টি চক্র সপ্ত রশ্মি
৬টি অর=৬ ঋতু ।

পুরীষী[জলবর্ষণকারী]=জীব যেমন অন্ন জলাদি গ্রহণ করে তা পুরীষ[মল] ত্যাগ করে তেমনি আদিত্য সংজ্ঞাত্মক সূর্য তাঁরকিরণ দ্বারা জল বাষ্পীভূতকরণপূর্বক মেঘাদি ও তৎ পশ্চাৎ বৃষ্টিকে মলের ন্যায় ত্যাগ করেন ।
সুতরাং আদিত্য সূর্য ও সংবৎসর দুটোই বোঝায় ।


উক্ত মন্ত্রে আদিত্যের ১২ রূপের ব্যাখ্যা বৃহদারণ্যক এ বলা হয়েছে নিম্নরূপ

শাকল্য: আদিত্যগণ কে কে ?
যাজ্ঞবল্ক্য:সংবৎসরের যে ১২টি মাস ইহারাই আদিত্য । ইহারা সকলকে লইয়া[আদদানাঃ] চলিয়া যান[যন্তি],এই জন্য ইহাদের নাম আদিত্য ।
বৃহদারণ্যক ৩.৯.৫


অর্থাৎ দ্বাদশ মাসই আদিত্য তথা সংবৎসরের ১২টি রূপ ।

এখন আদিত্য শব্দের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণে পাচ্ছি -

সুতরাং আদিত্য শব্দের অর্থ আমরা পাচ্ছি -
১.সূর্য , তথা মধ্যগগনের বিষ্ণু বা সুর্য
২.সংবৎসর তথা ১২ মাস
৩.অখণ্ডনীয় পদার্থ ।
আমরা আগেই দেখিয়েছি এখানে আদিত্য মধ্যে বিষ্ণু সূর্য করা পুনরুক্তি দোষে দুষ্ট হবে । দ্বিতীয়তঃ যদি আদিত্য মাস ধরা হয় তবেও তা ভুল হবে । কারণ গীতাতেই পরবর্তীএকটি শ্লোকে আলাদা করে মাসের কথা উল্লেখ রয়েছে

বৃহৎসাম তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসামহম্ ।
মাসানাং মার্গশীর্ষোহহমৃতূনাং কুসুমাকরঃ ।।
গীতা ১০.৩৫
=>> আমি সামবেদোক্ত মন্ত্রসকলের মধ্যে বৃহৎ সাম, ছন্দোবিশিষ্ট মন্ত্রের মধ্যে গায়ত্রী; আমি বৈশাখাদি দ্বাদশ মাসের মধ্যে অগ্রহায়ণ মাস, এবং ঋতুসকলের মধ্যে বসন্ত ঋতু ।

অর্থাৎ এখন আদিত্য অর্থ রইল কেবলমাত্র অখণ্ডনীয় পদার্থ ।
.
এরপর বিষ্ণুর অর্থ সূর্যের পাশাপাশি ব্যাকরণগত ভাবে পাই সর্বব্যাপক ঈশ্বর । এটি বৈদিক কোষেও উল্লেখিত হয়েছে ।
.
পরবর্তী শঙ্কাটি হচ্ছে "নক্ষত্রদের মধ্যে আমি চন্দ্র " । বৈদিক জ্যোতিষ মতে ২৮টি (মতান্তরে ২৭টি ) নক্ষত্র রয়েছে ।

২৮টি নক্ষত্রের নাম যথাক্রমে –

(১) অশ্বিনী (২) ভরণী (৩) কৃত্তিকা (৪) রোহিণী (৫) মৃগশিরা (৬) আর্দ্রা (৭) পুনর্বসু (৮) পুষ্যা (৯) রেবতী (১০) অশ্লেষা (১১) মঘা (১২) পূর্বফাল্গুনী (১৩) উত্তরফাল্গুনী (১৪) হস্তা (১৫) চিত্রা (১৬) স্বাতী (১৭) বিশাখা (১৮) অনুরাধা (১৯) জ্যেষ্ঠা (২০) মূলা (২১) পূর্বাষাঢ়া (২২) উত্তরাষাঢ়া (২৩) শ্রবণা (২৪) ধনিষ্ঠা (২৫) শতভিষা (২৬) পূর্ব্বভাদ্রপদ (২৭) উত্তরভাদ্রপদ (২৮) অভিজিৎ


এখানে নক্ষত্রের সংজ্ঞা বর্তমানে প্রচলিত সংজ্ঞার মত নয় । উদাহরণ স্বরূপ

পরমাণুর ইংরেজি প্রতিভাষ্য Atom যা গ্রীক শব্দ থেকে Atomos এসেছে । অর্থ অবিভাজ্য কণা । কারণ প্রাচীন ধারণামতে পরমাণু অবিভাজ্য । কিন্তু পরমাণুর প্রোটন এবং নিউট্রন কোয়ার্ক নামক আরো ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা গঠিত বলে বিভাজ্য । একমাত্র অবিভাজ্য উক্ত কোয়ার্ক এবং ইলেক্ট্রন । অর্থাৎ পরমাণু নামগত ভাবে অবিভাজ্য হলেও তার অভ্যন্তরীণ কণিকাও বিভাজ্য । কিন্তু এতে তার নামের পরিবর্তন করা হয়নি । আর জ্যোতিষে নক্ষত্রের বিষয়টি একটু ব্যতিক্রম ।

ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে নক্ষত্র হল চন্দ্রপথএর ২৮ ভাগের প্রতিটির নাম যেগুলো চন্দ্রনিবাস নামে পরিচিত । সূর্যের গতিপথকে যেমন ১২ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে রাশি তেমনি চন্দ্রপথকে ২৮ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে নক্ষত্র ।

বিভিন্ন দেশে এই চন্দ্রনিবাসসমূহের নাম বিভিন্ন । ভূমধ্যাঞ্চলীয় আরব ও পূর্বাঞ্চলীয় চীনসময় পরিমাপের এ প্রাকৃতিক ঘড়িটিকে ২৮ ভাগেই ভাগ ক'রে নিয়েছে । আরবীয়রা একে বলে মঞ্জিল আর চীনাদের কাছে এ সিউনামে পরিচিত । মিশরেও এমন একআকাশবিভাজন পাওয়া যায় , যা ৩৬ ভাগে বিভক্ত দেকান নামে পরিচিত। গ্রিসেএধরণের কোন চন্দ্রনিবাস চর্চার কথা জানা যায় না । গণিতজ্যোতিষে গাণিতিকভাবে ১২.৮‌৫৩ (বা ১২° ৫১ ৩/৭') অংশে (degree) এক নক্ষত্র ও ২.৩ নক্ষত্রে এক রাশি হিসেব করা হয় ।

 অর্থাৎ নক্ষত্র এখানে চন্দ্রের বিভিন্ন অবস্থান নির্দেশ করছে । যেহেতু পৃথিবীর সম্পূর্ণ পরিক্রমা চন্দ্র ২৮ দিনে সমাপ্ত করে । ১ম দিনে যতটুকু চলে তার নাম অশ্বিনী, ২য় দিনে যতটুকু চলে তার নাম ভরণী, এভাবে ২৮ দিনে ২৮টি পথ ২৮টি নক্ষত্র নামে পরিচিত । শতপথ ব্রাহ্মণ,কল্পসুত্রে সুশৃঙ্খলতার জন্য নক্ষত্রানুসারে যজ্ঞ করার বিধি রয়েছে ।

কেউ যদি বলেন প্রাচীনকালে চন্দ্রের নিজস্ব আলো নেই এই তথ্য না জানাতে চন্দ্রকে নক্ষত্র বলা হয়েছে তবে তাদেরকে শ্রীকৃষ্ণেরও জন্মের পূর্ব এই বেদমন্ত্রটি স্বাধ্যায় করতে অনুরোধ করব-

যত্ ত্বা সূর্য স্বর্ভানু স্তমসাবিধ্যদাসুরঃ।
অক্ষেত্রবিদ্ যথা মুগ্ধো ভুবনান্যদীধয়ুঃ।।
ঋগবেদ ৫.৪০.৫
অর্থাৎ, হে সূর্য যাকে তুমি তোমার নিজ আলো উপহার স্বরূপ প্রদান করেছ(চাঁদ), তাঁর দ্বারা যখন তুমি আচ্ছাদিত হয়ে যাও, তখন আকস্মিক অন্ধকারে পৃথিবী ভীত হয়ে যায়।

এখানে স্পষ্টত সূর্য গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ চন্দ্র, রাহু নয় তাও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ঋগবেদ ১০.৮৫.৯ নির্দেশ করে যে সূর্য তাঁর কন্যা চন্দ্রকে নিজ আলো উপহার স্বরূপ প্রদান করে।

অর্থাৎ এটাই প্রমাণিত হচ্ছে আর্যরা চন্দ্রের আলো সূর্য থেকে আগত রশ্মির প্রতিফলন তা জানতেন । অতএব সর্বপ্রকার বিশ্লেষণ ও আলোচনার মাধ্যমে উক্ত শ্লোকটির যথার্থ অন্বয়-ভাষ্য নিম্নরূপ :-

आदित्यानामहं विष्णुर्ज्योतिषां रविरंशुमान् ।
मरीचिर्मरुतामस्मि नक्षत्राणामहं शशी ॥

পদার্থঃ ( অাদিত্যনাম্) অখন্ডনীয় পদার্থতে ( অহং, বিষ্ণুঃ) অামি বিষ্ণু ( জ্যোতিষাম্) জ্যোতির্ময় বস্তুত সমুহতে ( রবিঃ) সূর্য ( মরুতাম্) বায়ূতে মরীচি নামা বায়ু( নক্ষত্রাণাম্) নক্ষত্র মসুহের মধ্যে ( অহং,শশী) অামি চন্দ্রমা।


ভাষ্য- যদ্যপি এই সংসাররুপ বিভূতির স্বামী হওয়াতে এই সব বিভূতিসমুহ পরমাত্মার তথাপি মুখ্য মুখ্য বিভূতিসকল পরমাত্মাকে এই জন্য বর্ননা করেছে যে, তাকি পরমাত্মার ঐশ্বর্য মূখ্য মূখ্য রূপের অনুভব করিবার জন্য সহায়ক হবে,এই অভিপ্রায়ে অখন্ড বস্তুতে ব্যপক রূপ বিষ্ণু,জ্যোতির্ময় বস্তুসমুহের মধ্যে সূর্যরূপ বায়ুতে মরীচি নামা প্রকাশ রূপ বায়ু এবং নক্ষত্রের মধ্যে চন্দ্রমা পরমাত্মার রূপ বর্নানা করা হয়েছে।

No comments:

Post a comment