বেদে স্বর্গ নরক বলতে ইসলামের জান্নাত জাহান্নাম কে বোঝানো হয়নি - VedasBD.com

Breaking

Sunday, 18 November 2018

বেদে স্বর্গ নরক বলতে ইসলামের জান্নাত জাহান্নাম কে বোঝানো হয়নি


স্বর্গ নরক নিয়ে তাত্ত্বিক কথা অনেকে নানান ধরনের উদাহরণ দিয়ে পুরাণ লেখা হয়েছে।

পুরাণের কিছু মিথ্যাচার লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন অবস্থা যেখানে পতিত হলে উঠবার আর পথ থাকে না।


আপনি পুরাণের লেখা তখনই মানবেন যখন পবিত্র বেদ শাস্ত্রের লেখার সাথে মিল ও সংযুক্ত থাকবে।

☀ ক্রোধ হচ্ছে অগ্নি, যে সব ছারখার করে দেয়।

☀ লোভ হচ্ছে এমন মায়া যেটাতে জড়ালে ক্রমশঃ তাতেই আকৃষ্ট হয়ে যায়।

☀ মোহ হচ্ছে মাকড়সার জালের মতো, যে আষ্টে - পৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে।

গর্ব এমন পাহাড়, প্রথমে শিখরে তোলে। তারপর যখন ফেলে তখন সব কিছু চূর্ণ চূর্ণ হয়।

সুতরাং কর্ম যজ্ঞে গুরু সান্নিধ্য গ্রহণ করে
বিবেক, চিন্তাধারা, সদাচার ইত্যাদি দ্বারা এই রিপু গুলোকে আহুতি দিলে মানুষের আশে পাশেই স্বর্গ হবে।
.
অথর্ববেদ ৪/৩৪/২

অনস্যাঃ পুতঃ পবনেন শুদ্ধাঃ শুচয়ঃ

শুচিমপি যন্তি লোকম।
==> নৈষাং শিশনং প্রদহতি জাতবেদাঃ
স্বর্গ লোকে বহুস্ত্রৈণমেষাম।।
.
এবার দেখি মন্ত্রটির পদার্থ, মানে প্রত্যেক সংস্কৃত শব্দের বাংলা অর্থ==>>
.
" যিনি হাড় মাংসে বানানো শরীর ছেড়ে উপরে উঠে যায় অর্থাৎ স্থুল শরীর ভোগ করে উপরে উঠে যায়। যিনি (পুতঃ) পবিত্র বৃত্তিবান হয়ে (পবনেন শুদ্ধা) প্রাণায়াম দ্বারা শুদ্ধ জীবন গঠন করে (শুচয়) জ্ঞান দ্বারা দীপ্ত মস্তিষ্কশালী যে ব্যক্তি (শুচিম লোকম) পবিত্র লোক কে (অপয়ন্তি) প্রাপ্ত হয়। (এষাম) তাহার (শিশনম) উপস্থ ইন্দ্রীয় কে ( জাতঃবেদা) কামাগ্নি (প্রদহতি) সন্তপ্ত করতে পারে না। যে কামাগ্নি দ্বারা সন্তপ্ত না হয় তাহার ঘর স্বর্গে পরিণত হয় এবং (এষাম) তাহার এই (স্বর্গ লোকে) স্বর্গ লোকে (বহু স্ত্রৈনম) বোন, ভাতৃবধু,পত্নি, মাতা পূর্বক স্ত্রীর সহিত সুখপূর্বক নিবাস করে।

.
==>এবার দেখি মন্ত্রটির মূল বক্তব্য<==
.
"জ্ঞান-আহারী লোক ভৌতিক সুখ ছেড়ে উপরে উঠে প্রাণসাধনা করে পবিত্র নির্বাহ করে। যে লোক ইন্দ্রীয়
দ্বারা সন্তপ্ত না হয় তাদের ঘর স্বর্গ লোকে পরিণত হয়।"

উপরের মন্ত্রটি সম্পর্কে বলার পূর্বে আমাদের জানতে হবে স্বর্গ কাকে বলে? বৈদিক বিচারধারায় স্বর্গ বলতে বিশেষ কোন স্থানকে স্বীকার করা হয় নি বরং জীবনের সুখাবস্থা বা মৃত্যুর পর পরম পুরুষার্থ বা মোক্ষকেই স্বর্গ বলা হয়েছে ৷ 

স্বর্গ ও নরক নিয়ে শাস্ত্রে কি বলেছে?

সনাতন ধর্মের বৈদিক বিচারধারায় স্বর্গ বলতে বিশেষ কোন স্থানকে স্বীকার করা হয়নি। বরং জীবনের সুখাবস্থা বা মৃত্যুর পর পরম পুরুষার্থ বা মোক্ষকেই স্বর্গ বলা হয়েছে।

🔯 স্বর্গ সমন্ধে বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছেঃ-

অষ্টচক্র নবদ্বারা দেবনাং পুরযোধ্যা।
তস্যাং হিরণ্ময় কোশঃ স্বর্গো জ্যোতিষাবৃতা।।
(অথর্ববেদ ১০।২।৩১)

সরলার্থঃ এই শরীররূপ নগরী সব সূর্য্যাদি দেবের অধিষ্ঠানভূত। আট চক্র এবং নয় ইন্দ্রীয় দ্বার বিশিষ্ট এইনগরী অজেয়। এই নগরীতে এক প্রকাশময় কোশ আছে [মনোময় কোষ ] আনন্দময় জ্যোতি দ্বারা আবৃত।

অর্থাৎ বেদে দেবপুরী বা স্বর্গলোক বলতে মূলত এই শরীরকেই বোঝানো হয়েছে।

🔯 অথর্বেদে স্বর্গের বর্ণনা আরো দেওয়া রয়েছেঃ-

ঘৃতহৃদা মধুকূলা সুরোদকঃ ক্ষীরেন পূর্ণা উদকেশ দধ্ন।
ত্রতস্তা ধারা উপয়ন্ত সর্বাঃ স্বর্গে লোকে মধুম্য
পিন্বমানাঃ উপত্বা তিষ্ঠন্ত পুষ্করিণী সমন্তাঃ।
(অথর্ববেদ ৪।৩৪।৬)

এই মন্ত্রে স্বর্গতূল্য গৃহের বর্ণনা দিয়ে বলা হচ্ছে যে, এই গৃহে যেন ঘৃত, মধু, পবিত্র জল, দুধ, দধি কম না হয়। এই স্বর্গতুল্য গৃহপ্রদেশ মাধুর্য্যুক্ত রসের সেচনকারী হয় এবং চারিদিশাই পদ্মের সরোবর হয়।


স্বর্গ কি?

🔯 “বৈদিক কোশ” এর ১৪৭৫-৭৬ পৃষ্ঠায় স্বর্গের ব্যাখ্যা আছেঃ-

“স্বর্গ- স্বর্ + গ।

(১) সুখ প্রদান করে এমন পদার্থ।

(২) আনন্দময় মোক্ষ।

(৩) সুখার্থ পুরুষার্থ।

” অর্থাৎ দেখতে পাচ্ছি স্বর্গ এমন কোন স্থান নয় যেখানে রম্ভা উর্বশী অপ্সরা বা হুর বসবাস করবে । বরং জীবনের সুখাবস্থা বা মৃত্যুর পর পরম পুরুষার্থ বা মোক্ষকেই স্বর্গ বলা হয়েছে। এবার আসি নরক এর অর্থে।

🔯 ‘বৈদিক কোশ’ এর ৭৬৯ পৃষ্ঠায় ‘নরক’ এর ব্যাখ্যায় বলা আছেঃ-

নরক কিঃ-

(১) ন্যরকম্- নীচৈঃ গমনম্ অর্থাৎ নীচে বা অধঃপতিত হওয়া।

(২) নীচৈঃ অস্মিন্ অর্য়তে অর্থাৎ নীচ বা দুষ্ট মানুষদের সহবাস বা অনুকরণে নরকে যায় বা অধঃপতিত হয়।

” অর্থাৎ দেখতে পাচ্ছি নরক কোন আলাদা স্থানের নাম নয়। বরং দুষ্টলোকের সাথে থেকে অধপতিত হওয়াই নরক বা যে দুর্দশা প্রাপ্ত হয় সেটাই নরক। অর্থাৎ দেখতে পাচ্ছি যেসব শব্দের আধারে স্বর্গ নরক নামক কল্পিত স্থানের কথা তাদের বেদভাষ্যে উল্লেখ করেছেন তার কোন বৈদিক ব্যুৎপত্তিগত ভিত্তি নেই।

🔯 নরক

নরকঃ ন্যরকম্ - নীচৈঃ গমনম্ (নিচে গমন অর্থাৎ অধঃপতন)। নি এর অর্থ হচ্ছে নিচে এর লোপ ন হওয়ার কারনে ন্যরক হয় অর্থাৎ নরক!

নিরুক্ত ১।১১ এ তে রয়েছে - "ন জিহনায়ন্তো নরকে পতাম" অর্থাৎ কুটিল আচরন করে আমরা নরকে পতিত হই অর্থাৎ অধঃপাতিত হই।

🔯 স্বর্গ ও নরক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাঃ-

বেদের ইংরেজি অনুবাদকগণ সাধারণত সংস্কৃত দ্যৌ বা দ্যুলোক শব্দের অর্থ করেছেন “Heaven”, যা পড়ে কেও কেও ভাবছেন বেদে স্বর্গ নামক কোনো স্থানের কথা আছে। আসুন দেখে নেই বৈদিক শব্দকোষে ‘দ্যৌ’ বা দ্যুলোক শব্দের অর্থ কি?

🔯 “বৈদিক কোশ (শব্দকোষ)” এর ৭০৩ পৃষ্ঠায় লেখা আছে:

“দ্যুৎ(চমকানো) প্রকৃতির সাথে ডো প্রত্যয় যুক্ত হয়ে দ্যৌ শব্দ সিদ্ধ হয়। দ্যৌ + খু = দ্যু শব্দ নিষ্পন্ন হয়। এর অর্থ প্রকাশমান অর্থাৎ যা নিজে নিজেই প্রকাশিত হয়(যেমন: সূর্যাদি নক্ষত্র যারা নিজের আলোয় স্বয়ং প্রকাশিত)।

”একই শব্দকোষের ৭৩৯ পৃষ্ঠায় লেখা আছে “দ্যৌ = সূর্য” তাহলে বৈদিক শব্দকোষ থেকে দেখা যাচ্ছে দ্যুলোক হচ্ছে সেই স্থান যেখানে সূর্যাদি নক্ষত্রসমূহ বিচরণ করে। দ্বিতীয়ত অনুবাদক কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘অন্তরিক্ষ’ অর্থ করেছেন “Heaven”, এবার দেখে নেই ‘অন্তরিক্ষ’ এর বৈদিক অর্থ কি?

🔯 “বৈদিক কোশ” এর ৬০ পৃষ্ঠায় বলা আছেঃ-

‘অন্তরিক্ষ = অন্তরে ক্ষিয়তি’ অর্থাৎ মহাকাশ বা দ্যুলোক ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী যে স্থান তার নামই অন্তরিক্ষ’ অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি দ্যুলোক বা অন্তরিক্ষ কোনোটিই এমন কোন স্থানকে নির্দেশ করে না যা কিনা পুরাণ কোরানে বর্ণিত মৃত্যু পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত বিলাসময় কোন স্থান।

এবার দেখে নেই বৈদিক শব্দকোষে স্বর্গ নরক নামে পৃথিবী বহির্ভূত কোন বিলাসবহুল বা ভয়ার্ত কোন স্থানের কথা বলা আছে কিনা! অনেকে দ্যুলোককে স্বর্গলোক বলেন বৈদিক কোষেও একস্থানে দ্যুলোককে স্বর্গলোক বলা হয়েছে।

🔯 মৃত্যুর পর আপনি স্বকর্ম অনুযায়ী পুনর্জন্ম লাভ করবেন। এবং সে অনুযায়ী কর্ম ফল ভোগ করবেন এটাই নিয়ম।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

No comments:

Post a Comment